বাংলাদেশ বর্তমানে একটি বড় আর্থিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, যেখানে চলতি অর্থবছরে প্রায় ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করতে হবে দেশীয় ও বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের জন্য। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF)-এর সাম্প্রতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই ঋণ পরিশোধের চাপ দেশের অর্থনীতি ও সরকারি বাজেটে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলছে।
IMF সতর্ক করেছে, যদি দেশের আয়ের সংগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি না পায়, তবে বাংলাদেশের জন্য ঋণ পুনঃবিনিয়োগের ঝুঁকি বাড়বে। বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হলো “রোলওভার ঝুঁকি”, যা তখন উদ্ভব করে যখন মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ নতুন ঋণ দিয়ে প্রতিস্থাপন করার সুযোগ কমে যায়। এই পরিস্থিতি নতুন ঋণ গ্রহণকে কঠিন করে তুলতে পারে এবং বৈশ্বিক সুদের হার বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
IMF-এর আর্টিকেল IV পরামর্শ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জন্য সরকারের ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা ৩০.৫৯ বিলিয়ন ডলার, যা গত অর্থবছরের ২৬.৬৩ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে বেশি। আগামী অর্থবছরে এই পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পেয়ে ৩৩.৮৪ বিলিয়ন ডলার হতে পারে।
বাংলাদেশের ঋণ সম্পর্কিত পরিসংখ্যান (অর্থবছর ২০২৪–২৫)
| সূচক | পরিমাণ (বিলিয়ন ডলার) | জিডিপির শতাংশ |
|---|---|---|
| মোট ঋণ | ১৮৮.৭৯ | ৪১.০ |
| দেশীয় ঋণ | ১০১.২৪ | ২২.৬ |
| বৈদেশিক ঋণ | ৮৭.৫৫ | ১৮.৪ |
| দেশীয় ঋণ পরিশোধ | – | ৪.২ |
| বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ | – | ১.২ |
| দেশীয় আয়ের ঋণ অনুপাত | – | ৮৯.৪ |
সরকারের আয় ৮৯.৪% দেশীয় ঋণ পরিশোধে বরাদ্দ, যা তুলনামূলক অর্থনীতির চেয়ে অনেক বেশি। দেশীয় ঋণের নেট বৃদ্ধি ০.৩% কমেছে, তবে আগামী বছরগুলোতে এটি গড়ে ২% হওয়ার আশা করা হচ্ছে।
IMF সতর্ক করেছে, এত উচ্চ ঋণ-পরিশোধ অনুপাত মধ্যমেয়াদি পুনঃবিনিয়োগ ঝুঁকি বাড়ায়। সরকারি ঋণ নির্ভরতা ব্যক্তিগত খাতকে সঙ্কুচিত করতে পারে এবং ঋণের মোট ব্যয় বৃদ্ধি করতে পারে। বর্তমানে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ৭%-এর নিচে রয়েছে, যা সরকারি বাজেট পরিচালনায় সীমাবদ্ধতা সৃষ্টি করছে। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগামী বাজেটে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ৮% লক্ষ্য করা হয়েছে। IMF আরও সুপারিশ করেছে, সরকারি সিকিউরিটিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং প্রাইমারি ডিলার ব্যবস্থা শক্তিশালী করা উচিত, যা ঋণ টেকসই করতে সহায়তা করবে।
প্রাক্তন অর্থনৈতিক উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ উল্লেখ করেছেন, ঋণের ঝুঁকি “উচ্চ” থেকে “মধ্যম” পর্যায়ে নেমে এসেছে, তবে রপ্তানি আয় এবং রাজস্বের তুলনায় ঋণ পরিশোধের হার বেড়ে গেছে। তিনি রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধি এবং উচ্চ-সুদের বাণিজ্যিক ঋণ গ্রহণ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন।
IMF-এর বিশ্লেষণ স্পষ্ট: ঋণ ব্যবস্থাপনা উপেক্ষা করলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়বে। সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো রাজস্ব বৃদ্ধি, ঋণের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা, যাতে আসন্ন আর্থিক চাপ মোকাবেলা করা সম্ভব হয়।
এই প্রতিবেদনের আলোকে, দেশের অর্থনীতি ও ঋণনীতি সম্পর্কে সজাগ থাকার প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
