কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ রাশেদুল ইসলামকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে ক্যাম্পাস ও স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন মহল উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ফলে বিষয়টি বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনের অন্যতম আলোচিত ও সংবেদনশীল ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, অধ্যাপক ড. রাশেদুল ইসলাম ২০২৪ সালের ২ ডিসেম্বর উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে তিনি শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগে অধ্যাপক ও বিভাগীয় চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘদিনের শিক্ষকতা ও গবেষণা অভিজ্ঞতা থাকলেও তাঁর নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, জ্যেষ্ঠতা ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার বিবেচনায় আরও কয়েকজন সিনিয়র অধ্যাপক থাকলেও তাঁদের পাশ কাটিয়ে তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অংশের অভিযোগ, রাজনৈতিক বিবেচনায় তাঁর নিয়োগ হয়েছে এবং একটি বিতর্কিত মতাদর্শিক সংগঠনের সুপারিশ এতে ভূমিকা রেখেছে। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, বর্তমান প্রশাসনের সময় ক্যাম্পাসে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে উপাচার্যের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক লিখিত বক্তব্য প্রকাশিত হয়নি।
শিক্ষক-শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের মতে, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে নিয়োগ ও পদায়নের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় আইন এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) প্রণীত বিধিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রচলিত বিধিমালা অনুযায়ী উপাচার্য নিয়োগে জ্যেষ্ঠতা, একাডেমিক কৃতিত্ব, গবেষণা অবদান ও প্রশাসনিক দক্ষতা বিবেচ্য বিষয় হিসেবে গুরুত্ব পাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে সেই মানদণ্ড কতটা অনুসৃত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
নিচে উপাচার্য নিয়োগসংক্রান্ত প্রাসঙ্গিক তথ্যের একটি সংক্ষিপ্ত সারণি উপস্থাপন করা হলো—
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| নাম | অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ রাশেদুল ইসলাম |
| দায়িত্ব গ্রহণ | ২ ডিসেম্বর ২০২৪ |
| পূর্ববর্তী কর্মস্থল | শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় |
| বিভাগ | কীটতত্ত্ব |
| উত্থাপিত অভিযোগ | রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ, নীতিমালা লঙ্ঘন |
| বর্তমান দাবি | পদত্যাগ |
অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের নজির রয়েছে। তাঁদের মতে, রাজনৈতিক আনুগত্যকে প্রাধান্য দিয়ে অপেক্ষাকৃত জুনিয়র শিক্ষকদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হলে তা উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও মানদণ্ডকে ক্ষুণ্ন করে।
অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট মহলের একটি অংশ মনে করে, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ উত্থাপিত হলে তা প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তদন্ত হওয়া উচিত। একতরফা প্রচার বা রাজনৈতিক মেরুকরণ শিক্ষার পরিবেশকে আরও অস্থির করে তুলতে পারে। তাঁদের পরামর্শ, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।
শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা, জবাবদিহিতা ও একাডেমিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। রাজনৈতিক প্রভাব, স্বচ্ছতার অভাব কিংবা মতাদর্শগত বিভাজন দীর্ঘমেয়াদে গবেষণা, শিক্ষার মান ও আন্তর্জাতিক সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
সার্বিকভাবে, কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান পরিস্থিতি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মুখে। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং সংলাপের মাধ্যমে আস্থার পরিবেশ পুনর্গঠনই এ সংকট উত্তরণের প্রধান উপায় বলে সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত।
