চারণ কবি মুকুন্দ দাসের দেশপ্রেম ও কীর্তি

“হাসি হাসি পরবো ফাঁসি,
দেখবে জগৎবাসী—
একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি।”

এই অগ্নিস্বরের কবি ছিলেন চারণ কবি মুকুন্দ দাস, যিনি কেবল কবি ও সুরকার নন, বরং যাত্রাপালা রচয়িতা এবং দেশপ্রেমের প্রেরণাদাতা হিসেবেও পরিচিত। ১৮৭৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মুন্সিগঞ্জ জেলার বিক্রমপুর পরগণার বানরী গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। জন্মকালে তাঁর নাম রাখা হয়েছিল যজ্ঞেশ্বর দে, পিতা গুরুদয়াল দে ও মাতা শ্যামাসুন্দরী দেবীর কৃপায়। পরে বৈষ্ণব সন্ন্যাসী রামানন্দ অবধূতের দীক্ষায় তিনি ‘মুকুন্দ দাস’ নাম গ্রহণ করেন।

শৈশব ও সঙ্গীতপ্রতিভা

পদ্মা নদীর ভাঙনে জন্মভূমি হারিয়ে পরিবারসহ বরিশালে স্থানান্তরিত হন। সেখানে তিনি কীর্তনদলে যোগ দিয়ে সুকণ্ঠ গায়ক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। মাত্র উনিশ বছর বয়সে রচিত ‘সাধনসঙ্গীত’ সংকলনে একশো গানের মাধ্যমে তাঁর প্রতিভার পূর্ণ প্রমাণ মেলে।

স্বদেশী আন্দোলনে প্রেরণা

বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন (১৯০৫) এবং পরবর্তী স্বদেশী ও অসহযোগ আন্দোলনে মুকুন্দ দাসের গান ও যাত্রাপালা বাঙালির হৃদয়ে দেশপ্রেম ও উত্তেজনা সঞ্চার করে। তাঁর প্রধান রচনা এবং প্রভাব নিচের টেবিলে সংক্ষেপ করা হলো:

রচনাবিষয়বস্তুপ্রভাব
মাতৃপূজামাতৃভক্তি ও দেশপ্রেমনাটক বাজেয়াপ্ত, বিপ্লবী প্রেরণা সৃষ্টি
সমাজসামাজিক সজাগতাসাধারণ মানুষকে চিন্তাশীল করা
পথজীবনদর্শন ও নৈতিকতামানবিক মূল্যবোধে প্রভাব
পল্লীসেবাগ্রামীণ উন্নয়ন ও সমাজসেবাগ্রামাঞ্চলে জনগণের চেতনা বৃদ্ধি
কর্মক্ষেত্রশ্রমিক ও সাধারণ মানুষের সংগ্রামশ্রমজীবী জনগণকে অনুপ্রাণিত করা

ব্রিটিশ শাসকের বিরোধী বক্তব্য এবং বিপ্লবী প্রেরণার কারণে তাঁকে গ্রেফতার করে দিল্লি কারাগারে আড়াই বছরের সশ্রম দণ্ড দেওয়া হয় এবং তাঁর নাটক ‘মাতৃপূজা’ বাজেয়াপ্ত করা হয়।

কীর্তি ও সম্মান

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ-এর আমন্ত্রণে কলকাতায় যাত্রাপালা মঞ্চস্থ করেন। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি ও আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু-এর বাড়িতেও তাঁর পরিবেশনা প্রশংসিত হয়। কাজী নজরুল ইসলামও তাঁকে সাক্ষাৎ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিলেন। গ্রামের প্রতিটি কোণে গান গেয়ে তিনি স্বাধীনতার দীপ জ্বালিয়েছেন।

১৯৩৪ সালের ১৮ মে চারণ কবি মুকুন্দ দাসের অগ্নিকণ্ঠ চিরতরে থেমে যায়। তবে তাঁর সুর ও গান আজও উচ্চারণ করা হয়, যা প্রমাণ করে—দেশমাতৃকার জন্য জীবনও তুচ্ছ।

চারণ কবি মুকুন্দ দাসকে গভীর শ্রদ্ধা ও স্মৃতির সঙ্গে স্মরণ করা হয়, যিনি কেবল সাহিত্যিক নন, বরং জনগণের কণ্ঠস্বর ও সংগ্রামের অনুপ্রেরণা ছিলেন।