বিশ্বখ্যাত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ম্যাকিনজি অ্যান্ড কোম্পানি (McKinsey & Company) তাদের ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির এক প্রতিবেদনে বীমা খাতের এক উজ্জ্বল ও সম্ভাবনাময় চিত্র তুলে ধরেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেনারেটিভ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা জেনারেটিভ এআই (Generative AI) বিশ্বব্যাপী বীমা খাতে ৫০ বিলিয়ন থেকে ৭০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত রাজস্ব বা আয় বৃদ্ধির দুয়ার খুলে দিতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই জয়যাত্রা কেবল প্রযুক্তিগত উন্নয়নই নয়, বরং পুরো বীমা শিল্পের ব্যবসায়িক মডেলে এক আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসছে।
এআই-এর প্রভাবে রাজস্ব বৃদ্ধির মূল ক্ষেত্রসমূহ
ম্যাকিনজির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এআই-এর এই বিশাল আর্থিক সুবিধা মূলত তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে আসবে:
বিপণন ও বিক্রয়: গ্রাহকের পছন্দ ও আচরণ বিশ্লেষণ করে সঠিক সময়ে সঠিক বীমা পলিসি প্রস্তাব করার মাধ্যমে বিক্রয় বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
গ্রাহক সেবা কার্যক্রম: চ্যাটবট এবং উন্নত অটোমেশন ব্যবহারের মাধ্যমে গ্রাহকের সমস্যার দ্রুত সমাধান এবং নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং: বীমা কোম্পানিগুলোর অভ্যন্তরীণ সফটওয়্যার তৈরি ও ব্যবস্থাপনায় এআই-এর ব্যবহার খরচ কমিয়ে দক্ষতা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেবে।
বিনিয়োগের চিত্র: যুক্তরাষ্ট্র বনাম ইউরোপ
২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে বড় বড় বিনিয়োগের গতি কিছুটা ধীর হলেও বীমা খাতে বেসরকারি ইক্যুইটি (Private Equity) বিনিয়োগ ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র এই দৌড়ে অনেকটা এগিয়ে রয়েছে। ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে বীমা খাতে বিনিয়োগ প্রতি বছর গড়ে ২৬% হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে, ইউরোপের চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন; সেখানে একই সময়ে বিনিয়োগের হার বার্ষিক গড়ে প্রায় ১৮% হ্রাস পেয়েছে।
বীমা খাতের বিভিন্ন উপ-খাতের বিনিয়োগ পরিস্থিতি:
| উপ-খাত (Sub-sector) | বিনিয়োগের প্রকৃতি ও প্রবৃদ্ধি |
| বীমা ব্রোকার (Brokers) | মোট ডিল বা চুক্তির প্রায় ৭০% এদের দখলে, তবে বাজার পরিপক্ক হওয়ায় প্রবৃদ্ধি ২০% কমেছে। |
| এমজিএ (MGA) | ম্যানেজিং জেনারেল এজেন্টদের প্রিমিয়াম ২০২০ সালে ৪৭ বিলিয়ন থেকে ২০২৪ সালে ৯৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। |
| টিপিএ (TPA) | থার্ড-পার্টি অ্যাডমিনিস্ট্রেটরদের ক্ষেত্রে গত ৫ বছরে বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৫%। |
| সফটওয়্যার ও ডাটা সরবরাহকারী | নিয়মিত রাজস্ব (Recurring Revenue) আসার ফলে এই খাতে বিনিয়োগ অত্যন্ত স্থিতিশীল। |
সময় সাশ্রয় ও কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি
এআই ব্যবহারের ফলে বীমা খাতের সবচেয়ে বড় উন্নতি হচ্ছে এর কার্যসম্পাদনের গতিতে। আগে একটি বীমা পলিসির আন্ডাররাইটিং বা কোটেশন তৈরি করতে যেখানে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগত, এখন এআই-এর কল্যাণে তা মাত্র কয়েক দিনে নেমে এসেছে। কিছু ক্ষেত্রে ২-৩ দিনের কাজ মাত্র ১-২ ঘণ্টার মধ্যেই সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে। এটি কেবল গ্রাহক ভোগান্তিই কমায় না, বরং প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করে।
ম্যাকিনজির প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বর্তমান বীমা মডেলগুলোকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করবে না, বরং সেগুলোকে আরও আধুনিক ও শক্তিশালী করে তুলবে। তবে এই প্রযুক্তির সুফল কতটুকু পাওয়া যাবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কার্যকরভাবে এই প্রযুক্তি গ্রহণ এবং তার প্রয়োগ ঘটাতে পারছে তার ওপর।
