বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি বর্তমানে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। ঋণের সুদ পরিশোধ, নিম্নমানের কর আদায়, খেলাপি ঋণ, ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি ও শাসনব্যবস্থার দুর্বলতার সংমিশ্রণ দেশের অর্থনীতিকে অতিমাত্রায় চাপের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এর প্রভাবে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমছে, আর সরকারের বড় ধরনের সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা ক্ষীণ হচ্ছে। বাজেটের ঘাটতি মেটাতে সরকারের নির্ভরতা ক্রমশ বাড়ছে দেশি ও বিদেশি ঋণের ওপর।
অন্তর্বর্তী অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ নতুন অর্থমন্ত্রীর জন্য উত্তরাধিকার নোটে সামষ্টিক অর্থনীতির সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেছেন। নোটে মূলত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বাজারে আস্থা পুনঃস্থাপন এবং রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চলমান সংস্কার বাস্তবায়ন, কর অব্যাহতি পর্যালোচনা, আয়কর ব্যবস্থায় ডিজিটালাইজেশন এবং কাস্টমস আধুনিকায়নের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বাজারে ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি, মুদ্রা ও আর্থিক খাতের অবস্থা, বৈদেশিক খাতের চ্যালেঞ্জ এবং উন্নয়ন সহযোগীদের চলমান কর্মসূচি নোটে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যাংক খাতের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ—২০০৮-২০২৩ সালের মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে প্রায় ৯২ হাজার কোটি টাকা অনিয়মের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ব্যাংক খাতের মোট ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশ খেলাপি। আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতেও একই অবস্থা বিরাজ করছে।
ঋণ ও সুদের পরিস্থিতি
| খাত | সুদের হার বৃদ্ধি (গত বছর তুলনায়) | মূল সমস্যা | প্রভাব |
|---|---|---|---|
| আমানত | +0.58% | ঋণের প্রবাহ কমা | বেসরকারি খাত কম ঋণ নিচ্ছে |
| ঋণ | +0.46% | খেলাপি ঋণ, পুঁজি ঘাটতি | অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্থবির |
অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংক খাতের জন্য নানা আইন প্রণয়ন ও সংশোধন করেছে—ব্যাংক কোম্পানি আইন (সংশোধন), ফিন্যান্স কোম্পানি আইন, সিকিউরড ট্রানজেকশন আইন, নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্ট, অর্থ ঋণ আদালত আইন (সংশোধন) এবং আমানত সুরক্ষা অধ্যাদেশ। ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন ও তদারকির জন্য ব্যাংক রিসলিউশন অর্ডিন্যান্স ২০২৫ কার্যকর হয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে ব্যাংক রিসোলিউশন ইউনিট গঠন করা হয়েছে। পাঁচটি ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে অস্থায়ী প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার জন্য ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারকে ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে।
অগ্রাধিকার ও প্রত্যাশা
অর্থ উপদেষ্টা বলেছেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি ব্যবস্থা, বাজার পর্যবেক্ষণ, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা এবং সমন্বিত রাজস্ব ও মুদ্রানীতি চালু রাখা জরুরি। ভ্যাট অটোমেশন ও ই-ইনভয়েসের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অন্তর্বর্তী সরকার নির্ধারিত পদক্ষেপ নিয়েছে। জুনে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৭ শতাংশে আসবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি ইতোমধ্যেই ৯ শতাংশের নিচে নেমেছে।
বৈদেশিক খাতে আমদানির প্রবৃদ্ধি থাকলেও রপ্তানির প্রবৃদ্ধি কম। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে উৎপাদনের অপ্রতুলতা রপ্তানিকে বাধাগ্রস্ত করছে। নতুন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে ব্যাংক ও আর্থিক খাতকে শক্তিশালী আইনি ভিত্তিতে আনা এবং চলমান সংস্কার কার্যক্রম জোরদার করা।
সার্বিকভাবে, ঋণের সুদ চাপ, মূল্যস্ফীতি ও ব্যর্থ ব্যাংক ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে অর্থনীতি একটি সংবেদনশীল সময়ে রয়েছে। নতুন অর্থমন্ত্রীর কাছে উত্তরাধিকার নোটে বিস্তারিত প্রস্তুতি ও সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে, যা ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য মাইলফলক হতে পারে।
