চীনের ঐতিহ্যবাহী চন্দ্র নববর্ষ তথা বসন্ত উৎসবকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম বার্ষিক গণ-অভিবাসন, যা স্থানীয়ভাবে ‘চুনইউন’ নামে পরিচিত। পরিবারের সঙ্গে উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করতে শহর থেকে গ্রামে ফেরার এই নাড়ির টানে চলা যাত্রা কেবল একটি সাংস্কৃতিক প্রথাই নয়, বরং এটি চীনের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির জন্য এক বিশাল চালিকাশক্তি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবারের উৎসব ঘিরে যে বিপুল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছে, তা চীনের প্রবৃদ্ধির ধারায় নতুন গতি সঞ্চার করবে।
চুনইউন ২০২৬: যাতায়াত ও পরিসংখ্যানে নতুন রেকর্ড
চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই ৪০ দিনব্যাপী চুনইউন উৎসব চলবে মার্চ মাস পর্যন্ত। এর মধ্যে ১৫ থেকে ২৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টানা এক সপ্তাহের সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। চীনা কর্মকর্তাদের প্রাক্কলন অনুযায়ী, এবার যাতায়াতের সংখ্যা পূর্বের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ৯৫০ কোটিতে পৌঁছাতে পারে। যাতায়াত ব্যবস্থার এই বিশাল কর্মযজ্ঞ চীনের পরিবহন ও অবকাঠামো খাতের সক্ষমতার এক বড় পরীক্ষা।
নিচে বসন্ত উৎসবকে কেন্দ্র করে যাতায়াত ও যাত্রী সংখ্যার একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র দেওয়া হলো:
| খাতের নাম | যাত্রী সংখ্যা ও পরিসংখ্যান | অর্থনৈতিক প্রভাব |
| রেলপথ | প্রায় ১০০ কোটি যাত্রী (৪০ দিনে) | আন্তঃশহর বাণিজ্যের গতি বৃদ্ধি |
| আকাশপথ | প্রতি সপ্তাহে ১৬.৩ কোটি যাত্রী | পর্যটন ও বিমান পরিবহন খাতের আয় বৃদ্ধি |
| সামগ্রিক যাত্রা | প্রাক্কলিত ৯৫০ কোটি ট্রিপ | গত বছরের তুলনায় কয়েকশ কোটি বেশি |
| ভিসা-মুক্ত প্রবেশ | ৪৫টির বেশি দেশ | আন্তর্জাতিক পর্যটনের পুনরুত্থান |
ভোক্তা ব্যয় ও সরকারি প্রণোদনা
চীনের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের মধ্যে সঞ্চয়ের প্রবণতা বাড়লেও খরচের হার ছিল কিছুটা কম। এই স্থবিরতা কাটাতে এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা চাঙ্গা করতে বেইজিং সরকার ৩ কোটি ৬০ লাখ ইউয়ান (প্রায় ৫ কোটি ২০ লাখ ডলার) মূল্যের ডিজিটাল ভোক্তা ভাউচার বিতরণের ঘোষণা দিয়েছে। এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হলো সাধারণ মানুষকে উৎসবের কেনাকাটা, রেস্তোরাঁ ও বিনোদন খাতে ব্যয় করতে উৎসাহিত করা।
এ বছর উৎসবের ছুটি একদিন বাড়ানো হয়েছে, যা পর্যটন ও খুচরা বিক্রয় খাতে বাড়তি আয়ের সুযোগ করে দিচ্ছে। থাইল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া এবং রাশিয়ার মতো দেশগুলোর সাথে ভিসা-মুক্ত যাতায়াত সুবিধা থাকায় চীন থেকে যেমন মানুষ বাইরে যাচ্ছে, তেমনি বিদেশি পর্যটকের আগমনও চীনের হোটেল ও পর্যটন শিল্পকে সমৃদ্ধ করছে।
বিনোদন ও সংস্কৃতি খাতের প্রভাব
বসন্ত উৎসব মানেই চীনের চলচ্চিত্র বাজারে নতুন প্রাণস্পন্দন। গত বছরের ব্লকবাস্টার অ্যানিমেশন ‘নে ঝাহ ২’-এর বিশাল সাফল্যের পর, এ বছর ‘পেগাসাস ৩’ এবং ‘স্কেয়ার আউট’-এর মতো বড় বাজেটের ছবিগুলো মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে। সিনেমা হলগুলোতে দর্শকদের এই ভিড় বিনোদন খাতের পাশাপাশি শপিং মলগুলোর বিক্রি বৃদ্ধিতেও সহায়ক ভূমিকা রাখছে। এছাড়া ঐতিহ্যবাহী খাবার, উপহার সামগ্রী এবং স্বাস্থ্যসেবা পণ্য বিক্রয়ও এই সময়ে কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়।
সার্বিকভাবে বলা যায়, ২০২৬ সালের এই বসন্ত উৎসব চীনের অর্থনীতির জন্য কেবল একটি উদযাপনের উপলক্ষ নয়; এটি ক্রমবর্ধমান দেশীয় চাহিদা, শক্তিশালী পরিবহন অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এক নতুন প্রতিফলন। ড্রাগন বর্ষের এই শুভ সূচনায় চীন তার অভ্যন্তরীণ বাজারকে যে গতিশীলতা প্রদান করছে, তা বিশ্ব অর্থনীতিতেও ইতিবাচক সংকেত পাঠাচ্ছে।
