পার্বত্য চট্টগ্রামের জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর নাশকতামূলক তৎপরতা দমনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় বান্দরবানের রুমা উপজেলার অত্যন্ত দুর্গম পার্বত্য এলাকায় কুকি-চিন ন্যাশনাল আর্মি (কেএনএ)—যারা কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) সশস্ত্র শাখা হিসেবে পরিচিত—তাদের একটি সম্ভাব্য অস্থায়ী আস্তানায় সফল অভিযান চালিয়েছে সেনাবাহিনী। বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) দিবাগত রাত ১টার দিকে সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এই বিশেষ অপারেশনটি পরিচালিত হয়।
Table of Contents
অভিযানের বিবরণ ও কৌশল
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) পাঠানো তথ্যানুযায়ী, রুমা জোনের সুদক্ষ কমান্ডো ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বিশেষ দল উপজেলার প্রতাপপাড়া নামক অত্যন্ত দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় এই অভিযান পরিচালনা করে। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গিয়েছিল যে, কেএনএ-র একটি দল ওই এলাকার ঘন জঙ্গলে অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করে নাশকতার পরিকল্পনা করছে।
সেনাবাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা গভীর জঙ্গলের সুযোগ নিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও তাদের ব্যবহৃত আস্তানাটি সেনাবাহিনী পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নেয়। প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১০ থেকে ১৫ সদস্যের একটি সশস্ত্র দল গত কয়েকদিন ধরে ওই এলাকায় অবস্থান করছিল। বর্তমানে ওই পুরো এলাকাটি ঘিরে ফেলা হয়েছে এবং সশস্ত্র সদস্যদের শনাক্ত করতে তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে।
উদ্ধারকৃত সরঞ্জাম ও আলামতের তালিকা
| উদ্ধারকৃত সামগ্রী | বিবরণ ও পরিমাণ |
| অস্ত্র ও গোলাবারুদ | ১টি সচল এয়ারগান ও কিছু ক্ষুদ্রাস্ত্রের সরঞ্জাম |
| দেশীয় অস্ত্র | বেশ কয়েকটি ধারালো দা ও ছুরি (দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি) |
| খাদ্যসামগ্রী | চাল, ডাল ও টিনজাত খাবারসহ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রসদ |
| পরিধেয় সামগ্রী | কেএনএ-র ব্যবহৃত বিশেষ পোশাক ও বুট জুতো |
| রান্নার সরঞ্জাম | হাড়ি-পাতিল ও গ্যাস সিলিন্ডারসহ আনুষঙ্গিক কিচেন সেট |
| অন্যান্য সরঞ্জাম | টর্চলাইট, ব্যাটারি ও পাহাড় কাটার বিশেষ যন্ত্রপাতি |
পার্বত্য অঞ্চলের নিরাপত্তা ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি বজায় রাখতে এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাধারণ মানুষকে সশস্ত্র গোষ্ঠীর ভীতি থেকে মুক্ত রাখতে সেনাবাহিনী দীর্ঘকাল ধরে কাজ করে যাচ্ছে। কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট বা কেএনএফ-এর মতো দলগুলো পাহাড়ে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে, যার ফলে স্থানীয় জুম চাষি এবং পর্যটন শিল্পের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। সেনাবাহিনীর এই অভিযান কেবল তাদের ঘাঁটি ধ্বংস করা নয়, বরং তাদের সরবরাহ ব্যবস্থা এবং মনস্তাত্ত্বিক শক্তিকেও দুর্বল করে দিয়েছে।
সেনাবাহিনী জানিয়েছে, পার্বত্য অঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অবাধ চলাচল এবং ঘাঁটি স্থাপনের যেকোনো অপচেষ্টা কঠোর হাতে দমন করা হবে। বিশেষ করে দুর্গম সীমান্ত এলাকা দিয়ে অবৈধ অস্ত্র ও মাদকের প্রবেশ রোধে টহল ও বিশেষ অভিযান নিয়মিত বিরতিতে অব্যাহত রাখা হয়েছে। স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বাসিন্দারাও এই শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় সেনাবাহিনীকে তথ্য দিয়ে এবং অন্যান্যভাবে সহযোগিতা করছেন, যা অভিযানের সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সেনাবাহিনীর বার্তা ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ
আইএসপিআর সূত্র আরও নিশ্চিত করেছে যে, জননিরাপত্তা এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যহত থাকবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত জটিল হওয়ায় ড্রোন এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সেনাবাহিনী আশা করছে, সাধারণ জনগণের পূর্ণ সমর্থনে পাহাড় খুব দ্রুতই সন্ত্রাসমুক্ত ও শান্তিময় জনপদে পরিণত হবে।
