দীর্ঘ ১৯ বছর পর পাকিস্তানের লাহোর শহর আবারও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী ঘুড়ি উৎসব ‘বসন্ত’ নিয়ে। ২০০৭ সালে ঘুড়ি উড়ানোর সময় ধারালো সুতা এবং আকাশমুখী গুলিবর্ষণের কারণে নিরাপত্তার খাতিরে নিষিদ্ধ হওয়া এই উৎসব এবার স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আনন্দে ভরিয়ে তুলেছে।
লাহোরের পুরোনো শহরের সরু গলি থেকে বহুতল ভবনের ছাদ পর্যন্ত উৎসবের আয়োজন জাঁকজমকপূর্ণ। আকাশে উড়ছে হাজার হাজার রঙিন ঘুড়ি, বাজছে ড্রামের তালে তালে ছন্দ, আর হইহুল্লোড় সৃষ্টি করছে উৎসবমুখর পরিবেশ। নতুন প্রজন্মের তরুণরা প্রথমবারের মতো নাটাই-সুতা হাতে ঘুড়ি উড়িয়ে আনন্দ উপভোগ করছে, যেখানে প্রবীণরা দীর্ঘ বিরতির পর তাদের প্রাচীন দক্ষতা প্রদর্শন করছেন।
২৫ বছর বয়সি সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার আবু বকর আহমেদ জানান, “এটি আমার জীবনের প্রথম ঘুড়ি উৎসব। আকাশে রঙিন ঘুড়ি দেখার আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।” অন্যদিকে, আমেরিকা থেকে আগত পর্যটক মিনা সিকান্দার বলেন, “এই উৎসব শুধুই ঘুড়ি ওড়ানোর প্রতিযোগিতা নয়, এটি সামাজিক বন্ধন ও ঐতিহ্যের মিলনমেলা।”
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পাকিস্তান সরকার ও লাহোর পুলিশ এবার বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে। উৎসব তিন দিনে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে এবং বড় আকৃতির ঘুড়ি ওড়ানো নিষিদ্ধ। বিপজ্জনক সুতা বিক্রি রোধে ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে পুলিশ অভিযান চালিয়ে প্রায় ১ লাখ ঘুড়ি এবং ২ হাজার সুতা রোল জব্দ করেছে। ড্রোন এবং সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে শহরের ছাদ ও রাস্তা তদারকিতে রাখা হয়েছে। লাহোর পুলিশের ডিআইজি ফয়সাল কামরান জানান, “শহরের ছাদে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছে যাতে কেউ নিষিদ্ধ সুতা বা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করতে না পারে।” বৈদ্যুতিক তারে সুতা লেগে শর্ট সার্কিট রোধে বিশেষ জালও স্থাপন করা হয়েছে।
নিচের টেবিলে এবার বসন্ত উৎসবে নেওয়া মূল নিরাপত্তা ব্যবস্থা সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
| নিরাপত্তা ব্যবস্থা | বিস্তারিত তথ্য |
|---|---|
| উৎসবকালীন সীমাবদ্ধতা | তিন দিনে উৎসব সমাপ্ত |
| বড় আকৃতির ঘুড়ি নিষিদ্ধ | বড় ঘুড়ি ওড়ানো বন্ধ |
| বিপজ্জনক সুতা জব্দ | প্রায় ২ হাজার রোল |
| ড্রোন ও সিসিটিভি ব্যবহৃত | শহরের ছাদ ও রাস্তা তদারকিতে ব্যবহৃত |
| মোটরসাইকেল নিরাপত্তা | হ্যান্ডেলে মেটাল রড বসানো |
| বৈদ্যুতিক জাল স্থাপন | শর্ট সার্কিট প্রতিরোধ |
উৎসব কেবল আনন্দের উৎস নয়, বরং লাহোরের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। রাস্তার হকার, রেস্তোরাঁ, হোটেল মালিক এবং স্থানীয় কারিগররা এর মাধ্যমে আর্থিকভাবে উপকৃত হয়েছেন। উৎসব সমর্থক ইউসুফ সালাহউদ্দিন বলেন, “ঘুড়ি বিক্রি এবং পর্যটকদের উপস্থিতি স্থানীয় ব্যবসার জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে।”
দীর্ঘ দুই দশক পর লাহোরের আকাশে রঙিন ঘুড়ির উড়ানকে পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ ঐতিহ্যের জয় হিসেবে দেখছেন। প্রবীণ ও নবীন প্রজন্মের মিলিত আনন্দ, সতর্ক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সামাজিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই বসন্ত উৎসব সত্যিই ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
