বিশ্বকাপে বাংলাদেশহীন এক অস্বস্তিকর অধ্যায়

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ইতিহাসে আজ শুরু হতে যাচ্ছে এক ব্যতিক্রমী, বিতর্কিত এবং বহুল আলোচিত অধ্যায়। ২০০৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ আয়োজনের পর থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতিটি আসরে নিয়মিত অংশগ্রহণকারী দল ছিল বাংলাদেশ। অথচ ২০২৬ সালের দশম আসরে এসে প্রথমবারের মতো এই বৈশ্বিক মঞ্চের বাইরে থাকতে হচ্ছে টাইগারদের। ভারত ও শ্রীলংকার যৌথ আয়োজনে শুরু হওয়া এই বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অনুপস্থিতি শুধু দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্যই নয়, বরং আন্তর্জাতিক ক্রিকেট রাজনীতির জন্যও এক বিব্রতকর বাস্তবতা হিসেবে সামনে এসেছে।

দীর্ঘ ১৯ বছরের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ইতিহাসে ক্রিকেটীয় নৈপুণ্যের চেয়ে রাজনীতির প্রভাব এতটা প্রবল কখনো দেখা যায়নি। মাঠের ব্যাট-বলের লড়াইকে ছাপিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে ক্ষমতার ভারসাম্য, বোর্ডগুলোর প্রভাব এবং কূটনৈতিক কৌশল। সমালোচকদের মতে, ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের অতিরিক্ত প্রভাবের কারণে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) ক্রমেই তাদের নিরপেক্ষ অবস্থান হারাচ্ছে। এর ফলশ্রুতিতেই বাংলাদেশের মতো একটি নিয়মিত ও পরীক্ষিত দলকে বিশ্বকাপের বাইরে থাকতে হচ্ছে বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।

এই সংকটের সূত্রপাত মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে আকস্মিকভাবে বাদ দেওয়ার ঘটনায়। এরপর নিরাপত্তা ঝুঁকি ও উগ্রবাদী চাপের আশঙ্কা তুলে ধরে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ভারতে বিশ্বকাপের ম্যাচ খেলতে অনাগ্রহ প্রকাশ করে এবং নিজেদের সব ম্যাচ শ্রীলংকায় আয়োজনের প্রস্তাব দেয়। তবে সেই প্রস্তাব আইসিসি গ্রহণ না করে উল্টো বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে স্কটল্যান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক বিতর্ক ও সমালোচনার জন্ম দেয়।

বাংলাদেশের প্রতি এই আচরণের প্রতিবাদে পাকিস্তানও কঠোর অবস্থান নেয়। তারা ১৫ ফেব্রুয়ারির বহুল আলোচিত ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ বর্জনের ঘোষণা দেয়। এতে আইসিসি বড় ধরনের আর্থিক সংকটের মুখে পড়ে। ধারণা করা হচ্ছে, ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ না হলে সম্প্রচার স্বত্ব, বিজ্ঞাপন এবং টিকিট বিক্রি মিলিয়ে প্রায় ৬,১১২ কোটি টাকার ক্ষতি হতে পারে। এই বিপুল ক্ষতির আশঙ্কায় আইসিসি পাকিস্তানকে মাঠে নামাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে, কারণ এই ম্যাচ ছাড়া বিশ্বকাপের আবেদন ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব অনেকটাই ম্লান হয়ে যাবে।

জাতীয় মর্যাদা ও নিরাপত্তার প্রশ্নে আপসহীন অবস্থান নেওয়ায় বাংলাদেশের এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যৎ ক্রিকেট রাজনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন অনেকেই। মাঠে দল না থাকলেও বাংলাদেশ পুরোপুরি অনুপস্থিত নয়। বিশ্বকাপে আম্পায়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন শরফুদ্দৌলা ইবনে শহীদ ও গাজী সোহেল, আর ধারাভাষ্যে থাকবেন অভিজ্ঞ কণ্ঠ আতহার আলী খান।

জাতীয় দলের হতাশা কিছুটা লাঘব করতে বিসিবি আয়োজন করেছে ‘অদম্য বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি কাপ’। ধূমকেতু, দুর্বার ও দুরন্ত—এই তিন দলের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই টুর্নামেন্ট ঘরোয়া ক্রিকেটে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

আজ কলম্বোয় পাকিস্তান-নেদারল্যান্ডস ম্যাচ দিয়ে ২০ দলের বিশ্বকাপের পর্দা উঠছে। ভারত ও শ্রীলংকার আটটি স্টেডিয়ামে মোট ৫৫টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। চার গ্রুপ থেকে সেরা দলগুলো সুপার এইট, সেমিফাইনাল পেরিয়ে ফাইনালে পৌঁছাবে। শিরোপার প্রধান দাবিদার হিসেবে ধরা হচ্ছে ভারত, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও পাকিস্তানকে। এরই মধ্যে ইতালির অভিষেক এই বিশ্বকাপে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

বাংলাদেশের জন্য এই বিশ্বকাপ নিঃসন্দেহে বিষাদময়। আবার বিশ্বকাপও অনুভব করবে টাইগারদের অনুপস্থিতি। মাঠে না থেকেও প্রতিবাদ, অবস্থান ও আলোচনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ যে বিশ্ব ক্রিকেটে নিজের শক্ত অবস্থান জানান দিয়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৬: সংক্ষিপ্ত তথ্য

বিষয়তথ্য
মোট দল২০
আয়োজক দেশভারত ও শ্রীলংকা
মোট ম্যাচ৫৫
গ্রুপ সংখ্যা
প্রাইজমানি১৬০ কোটি টাকা
ফাইনালের সম্ভাব্য ভেন্যুকলম্বো / আহমেদাবাদ
বাংলাদেশের প্রতিনিধি২ জন আম্পায়ার, ১ জন ধারাভাষ্যকার