বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি হিসেবে পরিচিত প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহে বছরের শুরুতেই সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এবং বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্থিতিশীলতার প্রভাবে চলতি ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম চার দিনেই দেশে এসেছে প্রায় ৫০ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার। দেশীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৬ হাজার ১৭৩ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ১২২ টাকা হিসেবে)। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই আশাব্যঞ্জক তথ্য উঠে এসেছে।
প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি ও তুলনামূলক চিত্র
গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এবারের প্রবৃদ্ধি চোখে পড়ার মতো। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথম চার দিনে রেমিট্যান্স এসেছিল ৪২ কোটি ২০ লাখ ডলার। সেই হিসেবে চলতি বছরের প্রথম চার দিনে আয় বেড়েছে ১৯.৯ শতাংশ। মূলত ডিসেম্বরের পর থেকেই রেমিট্যান্সের এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত রয়েছে। গত জানুয়ারি মাসে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ৩১৭ কোটি ডলার, আর ডিসেম্বরে এই অংক ছিল ৩২২ কোটি ডলার।
নিচে গত কয়েক মাসের প্রবাসী আয়ের একটি তুলনামূলক চিত্র উপস্থাপন করা হলো:
| মাস | প্রবাসী আয়ের পরিমাণ (বিলিয়ন ডলারে) | স্থিতি/প্রবণতা |
| জুলাই ২০২৫ | ২.৪৮ | স্বাভাবিক প্রবাহ |
| আগস্ট ২০২৫ | ২.৪২ | সামান্য হ্রাস |
| সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ২.৬৯ | ঊর্ধ্বমুখী |
| অক্টোবর ২০২৫ | ২.৫৬ | স্থিতিশীল |
| নভেম্বর ২০২৫ | ২.৮৯ | উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি |
| ডিসেম্বর ২০২৫ | ৩.২২ | রেকর্ড বৃদ্ধি |
| জানুয়ারি ২০২৬ | ৩.১৭ | উচ্চ প্রবাহ বজায় |
| ফেব্রুয়ারি ২০২৬ (৪ দিন) | ০.৫০৬ | ১৯.৯% প্রবৃদ্ধি |
নির্বাচনী প্রভাব ও ব্যাংক কর্মকর্তাদের পর্যবেক্ষণ
সাধারণত বাংলাদেশে ঈদুল ফিতর বা ঈদুল আজহার আগে রেমিট্যান্স প্রবাহে জোয়ার দেখা যায়। তবে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। ব্যাংক কর্মকর্তাদের মতে, আসন্ন সাধারণ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রবাস থেকে দেশে অর্থ আসার পরিমাণ বেড়েছে। নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা এবং প্রার্থীদের নানাবিধ নির্বাচনী খরচ মেটানোর জন্য প্রবাসী বাংলাদেশিরা আগের চেয়ে বেশি অর্থ পাঠাচ্ছেন। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও আমেরিকা—যেসব দেশে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংখ্যা বেশি, সেখান থেকেই বড় অংকের তহবিল আসছে। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশের মাটিতে প্রার্থীরা যে তহবিল সংগ্রহ করছেন, তাও রেমিট্যান্স আকারে দেশে প্রবেশ করছে। আর্থিক খাতের বিশ্লেষকদের ধারণা, নির্বাচনের আগ পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত থাকবে।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পূর্ণাঙ্গ বছরে দেশে মোট ৩ হাজার ২৮২ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে। এই বিশাল অংকের আয় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে অভাবনীয় ভূমিকা রেখেছে। গত বছর রেমিট্যান্সের গতি ভালো থাকায় ডলারের বাজারে কোনো তীব্র সংকট দেখা দেয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ডলার কিনে মজুত বাড়াতে সক্ষম হয়েছে, যা সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও পরোক্ষ সহায়তা দিয়েছে।
বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর জন্য সরকারের দেওয়া প্রণোদনা এবং ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের আকর্ষণীয় রেট প্রবাসীদের উৎসাহিত করছে। বর্তমানে রেমিট্যান্সের এই শক্তিশালী অবস্থান দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের সক্ষমতা বাড়াতে এবং রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে বড় সহায়ক হিসেবে কাজ করছে।
