শিক্ষানুরাগী ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মেহেরুননেসা চৌধুরীর মহাপ্রয়াণ

বাংলাদেশের নারী শিক্ষার অগ্রদূত এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন ও ছাত্র কল্যাণ ইতিহাসের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র মেহেরুননেসা চৌধুরী আর নেই। গত বৃহস্পতিবার ৯৪ বছর বয়সে রাজধানী ঢাকায় নিজ বাসভবনে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তিনি সন্তান-সন্ততিসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী ও ছাত্রছাত্রী রেখে গেছেন। আজ শুক্রবার যথাযথ রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় মর্যাদায় বনানী কবরস্থানে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়। তাঁর মৃত্যুতে দেশের শিক্ষাঙ্গনে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে।

শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনের অনন্য যাত্রা

মেহেরুননেসা চৌধুরী কেবল একজন শিক্ষিকাই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন এক দক্ষ প্রশাসক এবং মমতাময়ী অভিভাবক। তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৬২ সালে বরিশাল মহিলা কলেজে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে। ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত সেখানে অধ্যাপনা করার পর তিনি প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে তৎকালীন সময়ে দক্ষিণাঞ্চলে নারী শিক্ষার প্রসার ঘটেছিল।

পরবর্তীতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করেন। ১৯৬৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত—অর্থাৎ মহান মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে তিনি রোকেয়া হলের হাউস টিউটর হিসেবে কাজ করেছেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে তিনি রোকেয়া হলের প্রাধ্যক্ষ নিযুক্ত হন এবং পরবর্তীতে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত নবগঠিত শামসুন নাহার হলের প্রাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। হলের ছাত্রীদের কাছে তিনি কেবল একজন প্রশাসক ছিলেন না, বরং ছিলেন এক নির্ভরতার আশ্রয়স্থল।

এক নজরে মেহেরুননেসা চৌধুরীর বর্ণাঢ্য কর্মজীবন:

সময়কালপ্রতিষ্ঠান/সংস্থাপদবী
১৯৬২ – ১৯৬৬বরিশাল মহিলা কলেজশিক্ষক ও পরবর্তীতে অধ্যক্ষ
১৯৬৭ – ১৯৭১রোকেয়া হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়হাউস টিউটর
১৯৭২রোকেয়া হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়প্রাধ্যক্ষ (Provost)
১৯৭২ – ১৯৭৫শামসুন নাহার হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়প্রাধ্যক্ষ (Provost)
১৯৭৬ – ১৯৯৩ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (TSC), ঢাবিস্টুডেন্ট কাউন্সিলর
অবসরোত্তরলালমাটিয়া মহিলা কলেজচেয়ারপারসন ও বোর্ড অব ডিরেক্টরস

টিএসসি এবং ছাত্র কল্যাণ সেবা

প্রাধ্যক্ষ হিসেবে সফল মেয়াদ শেষ করার পর, ১৯৭৬ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (TSC) স্টুডেন্ট কাউন্সিলর হিসেবে নিয়োগ পান। ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৭ বছর তিনি এই পদে থেকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য, ক্যারিয়ার ও বিভিন্ন সমস্যা নিরসনে কাজ করেছেন। তাঁর পরামর্শে অসংখ্য শিক্ষার্থী তাঁদের জীবনের সঠিক পথ খুঁজে পেয়েছিলেন। অবসর গ্রহণের পর তিনি লালমাটিয়া কলেজের চেয়ারপারসন এবং বোর্ড অব ডিরেক্টরস হিসেবে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে আমৃত্যু শিক্ষার আলো ছড়িয়ে গেছেন।

পারিবারিক পরিচয় ও ব্যক্তিগত জীবন

ব্যক্তিগত জীবনে মেহেরুননেসা চৌধুরী ছিলেন অত্যন্ত মার্জিত এবং রুচিশীল একজন মানুষ। তিনি সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম আমিনুল হকের সহধর্মিনী। তাঁর সুযোগ্য পুত্র ফুয়াদ চৌধুরী দেশের একজন বিশিষ্ট চলচ্চিত্রকার এবং বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ‘দীপ্ত টিভি’-র সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)। পারিবারিক সূত্রেও তিনি সর্বদা সমাজসেবা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

মেহেরুননেসা চৌধুরীর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতো নিষ্ঠাবান শিক্ষাবিদদের আদর্শ আজকের প্রজন্মের শিক্ষকদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।