এশিয়া-প্যাসিফিকের বিমা খাতে বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায় গভীর সংকট ও উদ্বেগ

এশিয়া-প্যাসিফিক (APAC) অঞ্চলের বিমা খাতের নির্বাহী কর্মকর্তারা বর্তমানে তাঁদের বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে জটিল সম্পদ বা ‘কমপ্লেক্স অ্যাসেট’ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিয়ে আত্মবিশ্বাসের হার মাত্র ২৩ শতাংশে নেমে এসেছে। সম্প্রতি ‘ক্লিয়ারওয়াটার অ্যানালিটিক্স’ পরিচালিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ১৫০ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ওপর পরিচালিত এই জরিপে প্রায় ৩.৮ ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ব্যবস্থার চিত্র ফুটে উঠেছে।

তথ্য একীভূতকরণ ও সিস্টেমের সীমাবদ্ধতা

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিমা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘ডেটা ইন্টিগ্রেশন’ বা তথ্যের একীভূতকরণ। জরিপে অংশগ্রহণকারী ১৪৯ জন নির্বাহী জানিয়েছেন, বিভিন্ন বাহ্যিক ম্যানেজারদের কাছ থেকে ভিন্ন ভিন্ন ফরম্যাটে ডেটা পাওয়ার ফলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো সময়মতো বিশ্লেষণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। মাত্র ৪২ শতাংশ উত্তরদাতা তাঁদের বর্তমান সিস্টেমকে তথ্য একীভূতকরণের ক্ষেত্রে ‘উৎকৃষ্ট’ বলে মনে করেন। বাকি সিংহভাগ প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোই এখন আধুনিক বিনিয়োগের চাপের মুখে ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।

জটিল সম্পদ ও বৈচিত্র্যময় পোর্টফোলিও

বিনিয়োগের কৌশলে বিমা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বেসরকারি বাজার বা ‘প্রাইভেট মার্কেট’-এর দিকে ঝুঁকছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে তাদের বিনিয়োগের হার ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৩ শতাংশে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্ট্রাকচার্ড প্রোডাক্ট এবং এক্সোটিক অ্যাসেটের মতো জটিল বিনিয়োগের ক্ষেত্র বাড়লেও এগুলো সঠিকভাবে পরিচালনা করার মতো আধুনিক টুলের অভাব প্রকট। এছাড়া, ৮৮ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন যে আগামী তিন বছরে তাঁরা তাঁদের পোর্টফোলিওতে আরও বৈচিত্র্য আনতে চান।

নিচে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বিমা খাতের বর্তমান বিনিয়োগ চ্যালেঞ্জ ও আগামী দিনের পরিকল্পনার একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র দেওয়া হলো:

বিষয়বর্তমান পরিস্থিতি/হারমন্তব্য ও পর্যবেক্ষণ
জটিল সম্পদ ব্যবস্থাপনায় আত্মবিশ্বাস২৩%সর্বনিম্ন সক্ষমতার হার, যা সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।
ডেটা ইন্টিগ্রেশন সক্ষমতা (উৎকৃষ্ট)৪২%তথ্য একীভূতকরণে বড় ধরনের প্রযুক্তিগত ঘাটতি।
প্রাইভেট মার্কেট বিনিয়োগ বৃদ্ধি২০% থেকে ৩৩%আগামী ৫ বছরে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে।
বহিরাগত ম্যানেজার ব্যবহারের প্রবণতা৬৬%থার্ড-পার্টি ম্যানেজার ব্যবহারের ফলে তথ্যে বিশৃঙ্খলা বাড়ছে।
বিনিয়োগে বৈচিত্র্য আনার পরিকল্পনা৮৮%আগামী ৩ বছরে পোর্টফোলিও বহুমুখীকরণের লক্ষ্য।
ঝুঁকির মাত্রা বৃদ্ধি৭২%বিমা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন উচ্চতর রিস্ক প্রোফাইল রিপোর্ট করছে।

ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ ও কৌশলগত পরিবর্তন

ক্লিয়ারওয়াটার অ্যানালিটিক্সের চিফ স্ট্র্যাটেজি অফিসার শেন আকরয়েড বলেন, বেসরকারি বাজারে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং বহিরাগত ম্যানেজারদের ওপর নির্ভরশীলতা বেড়ে যাওয়ার ফলে অপারেশনাল এবং রিস্ক ম্যানেজমেন্টের চাহিদা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো এখন এই সংকট কাটাতে নতুন কৌশলে কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ নিয়োগ, কর্মীদের প্রশিক্ষণ বাড়ানো এবং অত্যাধুনিক প্ল্যাটফর্মে বিনিয়োগ। ৯৬ শতাংশ নির্বাহী মনে করেন যে সামনে মার্জার ও একুইজিশন (M&A) বা ব্যবসায়িক একীভূতকরণ কার্যক্রম বাড়বে। যারা আগেভাগে নিজেদের প্রযুক্তিগত ও তথ্যগত ঘাটতি পূরণ করতে পারবে, তারাই এই প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকবে।

পরিশেষে বলা যায়, এশিয়া-প্যাসিফিকের বিমা খাত এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। পুরোনো পদ্ধতি পরিহার করে যদি দ্রুত ডিজিটাল রূপান্তর এবং শক্তিশালী ডেটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম গ্রহণ করা না যায়, তবে ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগ জটিলতা জাতীয় অর্থনীতির জন্যও ঝুঁকির কারণ হতে পারে।