একসময় যেখানে পোড়ামাটির তীব্র গন্ধ আর কালো ধোঁয়ায় বাতাস ভারী থাকত, আজ সেখানে ছড়িয়ে আছে রঙিন ফুলের সুবাস। খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলার মুড়াপাড়ায় পরিত্যক্ত একটি ইটভাটাকে পরিবেশবান্ধব ফুলের বাগানে রূপান্তর করে নতুন এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তরুণ উদ্যোক্তা খালেদ মাসুদ সাগর। তাঁর গড়ে তোলা ‘স্বপ্নবিলাস ফ্লাওয়ার ভিলেজ’ এখন শুধু একটি ফুলের বাগান নয়; এটি পরিবেশ পুনরুদ্ধার, স্থানীয় কর্মসংস্থান এবং পাহাড়ি অঞ্চলে কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তার সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
খাগড়াছড়ি শহর থেকে প্রায় ২৪ কিলোমিটার দূরে রাঙামাটি–খাগড়াছড়ি সড়কের পাশে দুই একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই ফুলের গ্রামে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে সারি সারি সাজানো ফুলের বেড, পরিকল্পিত হাঁটার পথ, বসার বেঞ্চ এবং নান্দনিক ফটো কর্নার। দর্শনার্থীরা নামমাত্র ৩০ টাকা টিকিট কেটে বাগানে প্রবেশ করেন। সবুজ পাহাড়ের বুকজুড়ে রঙিন ফুলের এই সমাহার যেন প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের যত্নের এক নিখুঁত মেলবন্ধন।
আইনে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পরও খালেদ মাসুদ সাগর প্রচলিত চাকরির পথে না গিয়ে কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর ভাষায়, নিজের আয়ের পাশাপাশি অন্যদের কাজের সুযোগ সৃষ্টি করাই ছিল মূল লক্ষ্য। মহালছড়িতে বাড়ি হওয়ায় নিয়মিত যাতায়াতের পথে পরিত্যক্ত ইটভাটাটি তাঁর নজরে আসে। ছোটবেলা থেকেই ফুলের প্রতি আলাদা টান থাকায় ২০২৩ সালের শেষ দিকে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে ইটভাটাসহ আশপাশের জমি ইজারা নেন তিনি।
দীর্ঘ সংস্কারপ্রক্রিয়ার পর ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার, মাটি পুনর্গঠন ও পরিকল্পিত অবকাঠামো তৈরির মাধ্যমে ২০২৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ফুল চাষ শুরু হয়। বর্তমানে এখানে প্রায় ২০০ ধরনের ফুলের চার শতাধিক প্রজাতি রয়েছে। গাঁদা, গোলাপ, জবা, চন্দ্রমল্লিকা, ডালিয়া, সূর্যমুখী, অর্কিড, শিউলি, হাসনাহেনা, কাঠগোলাপ, অপরাজিতা ও দোলনচাঁপাসহ নানা রঙ ও ঘ্রাণের ফুলে বাগান সারা বছরই প্রাণবন্ত থাকে। পাহাড়ি মাটি ও আবহাওয়ার সঙ্গে মানানসই হওয়ায় শীত মৌসুমে এর সৌন্দর্য আরও বেড়ে যায়।
এই উদ্যোগ স্থানীয় মানুষের জন্যও আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। বর্তমানে এখানে ১৫ জন শ্রমিক নিয়মিত কাজ করছেন এবং মৌসুমি সময়ে আরও পাঁচজন অস্থায়ীভাবে যুক্ত হন। পাশাপাশি আশপাশের মানুষ ফুলের চারা কিনে নিজেরাও চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। দর্শনার্থীদের সুবিধার জন্য বাগানের এক পাশে ছোট কফি কর্নার ও রেস্টুরেন্ট চালু করা হয়েছে, যাতে পরিবেশ নষ্ট না হয় এবং নিরাপত্তাও নিশ্চিত থাকে।
স্বপ্নবিলাস ফ্লাওয়ার ভিলেজ ধীরে ধীরে খাগড়াছড়ির নতুন পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। শিক্ষার্থী, পরিবার ও প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এটি যেমন বিনোদনের স্থান, তেমনি শিক্ষণীয়ও। আর্থিক দিক থেকেও উদ্যোক্তাটি স্বাবলম্বিতার পথে এগোচ্ছে; ফুলের মৌসুমে সব খরচ বাদ দিয়ে মাসে প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা আয় হচ্ছে। ভবিষ্যতে ফুলের পাশাপাশি মাছ চাষ সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
স্বপ্নবিলাস ফ্লাওয়ার ভিলেজ: সংক্ষিপ্ত তথ্য
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| অবস্থান | মুড়াপাড়া, মহালছড়ি, খাগড়াছড়ি |
| মোট জমি | প্রায় ২ একর |
| বিনিয়োগের শুরু | ২০২৩ সালের শেষ |
| ফুলের ধরন | প্রায় ২০০ |
| প্রজাতি সংখ্যা | ৪০০-এর বেশি |
| নিয়মিত কর্মসংস্থান | ১৫ জন |
| দর্শনার্থী প্রবেশমূল্য | ৩০ টাকা |
পরিত্যক্ত ইটভাটার ধ্বংসস্তূপ থেকে ফুলের গ্রামে রূপান্তরের এই গল্প প্রমাণ করে—সঠিক পরিকল্পনা, সাহস ও শ্রম থাকলে প্রকৃতি ও অর্থনীতি একসঙ্গে সমৃদ্ধ করা সম্ভব।
