স্বর্ণ কেবল একটি মূল্যবান ধাতুই নয়, বরং এটি আভিজাত্য, ঐতিহ্য এবং নিরাপদ বিনিয়োগের এক অনন্য মাধ্যম। হাজার বছর ধরে মানুষ সম্পদ জমানোর মাধ্যম হিসেবে স্বর্ণকে বেছে নিয়েছে। তবে সাধারণ ক্রেতারা অনেক সময় স্বর্ণ কিনতে গিয়ে ক্যারেট, হলমার্ক, ভরি বা আনা—এই শব্দগুলোর সঠিক মারপ্যাঁচ বুঝতে না পেরে দ্বিধায় পড়েন। নিরাপদ ও সঠিক মানের স্বর্ণ কিনতে হলে এই বিষয়গুলোর খুঁটিনাটি জানা অত্যন্ত জরুরি।
Table of Contents
স্বর্ণের বিশুদ্ধতা ও ‘ক্যারেট’ কী?
ক্যারেট হলো স্বর্ণের বিশুদ্ধতা মাপার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড। খনি থেকে উত্তোলিত প্রাকৃতিক স্বর্ণ অত্যন্ত নরম হয়, যা দিয়ে গয়না তৈরি করা অসম্ভব। তাই গয়নাকে মজবুত করতে এর সঙ্গে তামা, রুপা বা দস্তার মতো কিছু ধাতু মেশানো হয়, যাকে প্রচলিত ভাষায় ‘খাদ’ বলা হয়। স্বর্ণে খাদের পরিমাণ যত কম, তার ক্যারেট তত বেশি এবং দামও তত বেশি।
১. ২৪ ক্যারেট: এটি ৯৯.৯ শতাংশ খাঁটি স্বর্ণ। এটি অত্যন্ত নরম হওয়ায় সাধারণত গয়না তৈরিতে ব্যবহৃত হয় না; বরং স্বর্ণের বার বা বিস্কুট হিসেবে বিনিয়োগের জন্য কেনা হয়।
২. ২২ ক্যারেট: বাংলাদেশে গয়না তৈরির জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো ২২ ক্যারেট। এতে ৯১.৬৭ শতাংশ খাঁটি স্বর্ণ থাকে। টেকসই ও উজ্জ্বল গয়নার জন্য এটিই আদর্শ।
৩. ২১ ক্যারেট: এতে ৮৭.৫ শতাংশ খাঁটি স্বর্ণ থাকে। এটি ২২ ক্যারেটের চেয়েও বেশি শক্ত, তাই সূক্ষ্ম ডিজাইনের আংটি বা চেইন তৈরিতে এটি ব্যবহৃত হয়।
৪. ১৮ ক্যারেট: এতে ৭৫ শতাংশ স্বর্ণ থাকে। হীরা বা অন্যান্য দামি পাথর বসানো গয়না তৈরির জন্য ১৮ ক্যারেট সবচেয়ে উপযোগী, কারণ এটি পাথরকে শক্তভাবে ধরে রাখতে পারে।
ওজন পরিমাপের সমীকরণ
বাংলাদেশে ঐতিহাসিকভাবে স্বর্ণ পরিমাপের জন্য ভরি, আনা ও রতি ব্যবহার করা হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে এবং বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে ‘গ্রাম’ এককে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ১ ভরি সমান ১১.৬৬৪ গ্রাম—এই সাধারণ হিসেবটি জানা থাকলে ক্রেতারা সহজেই দাম যাচাই করতে পারেন।
স্বর্ণের ক্যারেট ও হলমার্কিং সূচক
নিচে স্বর্ণের বিভিন্ন মান ও চেনার উপায় টেবিলের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| স্বর্ণের ক্যারেট | বিশুদ্ধতার হার (%) | হলমার্ক কোড | প্রধান ব্যবহার |
| ২৪ ক্যারেট | ৯৯.৯% | ৯৯৯.৯ | স্বর্ণের বার, কয়েন ও বিনিয়োগ। |
| ২২ ক্যারেট | ৯১.৬৭% | ৯১৬ | বিয়ের গয়না, চুড়ি ও নেকলেস। |
| ২১ ক্যারেট | ৮৭.৫% | ৮৭৫ | নিত্যদিনের গয়না ও সূক্ষ্ম কাজ। |
| ১৮ ক্যারেট | ৭৫% | ৭৫০ | ডায়মন্ড সেট ও পাথরের গয়না। |
হলমার্ক ও আধুনিক নিরাপত্তা পদ্ধতি
খাঁটি স্বর্ণ চেনার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায় হলো ‘হলমার্ক’ সিল যাচাই করা। অলঙ্কারের ভেতরের অংশে লেজার খোদাই করে নির্দিষ্ট কোড (যেমন ৯১৬ বা ৮৭৫) লেখা থাকে। বাজুস সভাপতি এনামুল হক খান দোলন জানিয়েছেন, আধুনিক যুগে স্বর্ণের ব্যবসায় স্বচ্ছতা আনতে তাঁরা অনলাইন হলমার্কিং পদ্ধতি চালু করছেন। এর মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট কিউআর কোড বা মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে ক্রেতারা জানতে পারবেন গয়নাটি কোন দোকানের, তার মান কত এবং সেটি আসল কি না।
সাবধানতা: ক্যাডমিয়াম ও কেডিএম সোনা
এক সময় স্বর্ণ জোড়া দেওয়ার জন্য ক্যাডমিয়াম ধাতু ব্যবহার করা হতো, যা ‘কেডিএম সোনা’ নামে পরিচিত ছিল। ক্যাডমিয়াম ব্যবহারের ফলে স্বর্ণের মান বজায় থাকলেও এটি কারিগর এবং ব্যবহারকারীর স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এ কারণে বর্তমানে স্বর্ণে ক্যাডমিয়াম মেশানোর ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। বর্তমান বাজারে ক্যাডমিয়ামের পরিবর্তে দস্তা বা রুপার সংকর ব্যবহার করা হয়।
গয়না কেনার সময় কেবল চাকচিক্য নয়, বরং স্বর্ণের হলমার্ক, মেকিং চার্জ এবং বর্তমান বাজার দর সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন। বাজুস নির্ধারিত প্রতিদিনের দাম যাচাই করে অনুমোদিত জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান থেকে স্বর্ণ কেনাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
