কিউবায় জ্বালানি সরবরাহ ঠেকাতে ট্রাম্পের নতুন শুল্ক হুমকি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিউবার ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও তীব্র করতে এক নতুন ও নজিরবিহীন কৌশল গ্রহণ করেছেন। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে এক ঘোষণায় তিনি জানিয়েছেন, যে দেশগুলো কিউবায় তেল সরবরাহ করবে, তাদের ওপর যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে কঠোর শুল্ক আরোপ করবে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে চলা কিউবা-যুক্তরাষ্ট্র বৈরী সম্পর্কের ইতিহাসে এই পদক্ষেপকে অন্যতম কঠোর এবং সরাসরি আক্রমণাত্মক হিসেবে দেখা হচ্ছে। কমিউনিস্ট-শাসিত এই দ্বীপরাষ্ট্রটিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে এই ‘শুল্ক যুদ্ধ’ বা ট্যারিফ ওয়ারকে পররাষ্ট্রনীতির প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন।

নির্বাহী আদেশ ও জাতীয় নিরাপত্তা অজুহাত

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে এই নতুন পদক্ষেপের অনুমোদন দিয়েছেন। যদিও এই আদেশে নির্দিষ্ট কোনো দেশের নাম উল্লেখ করা হয়নি এবং শুল্কের সঠিক হারও নির্ধারিত হয়নি, তবে এটি কিউবার আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহ চেইনকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করেছে। ট্রাম্পের দাবি, কিউবা সরকারের ‘ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড ও নীতি’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা এবং পররাষ্ট্রনীতির জন্য হুমকি স্বরূপ। তাই মার্কিন স্বার্থ রক্ষা করতেই এই কঠোর অর্থনৈতিক জবরদস্তি প্রয়োজন।

এক নজরে নতুন শুল্ক ঘোষণার মূল দিকসমূহ:

বিষয়বিস্তারিত তথ্য
ঘোষণা প্রদানকারীমার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
মূল লক্ষ্যকিউবায় তেল সরবরাহকারী দেশসমূহ
আইনি ভিত্তিজাতীয় জরুরি অবস্থার অধীনে নির্বাহী আদেশ
উদ্দেশ্যকিউবা সরকারকে অর্থনৈতিকভাবে শ্বাসরুদ্ধ করা
কিউবার প্রতিক্রিয়াপদক্ষেপটিকে ‘ফ্যাসিবাদী ও গণহত্যামূলক’ আখ্যা প্রদান

কিউবার তীব্র প্রতিবাদ ও মানবিক সংকট

ট্রাম্পের এই হুমকির জবাবে কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াস-কানেল অত্যন্ত কড়া ভাষায় এর সমালোচনা করেছেন। শুক্রবার সকালে তিনি ট্রাম্পের যুক্তিকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, এই ব্যবস্থা একটি নির্দিষ্ট চক্রের ফ্যাসিবাদী ও অপরাধমূলক চরিত্রকে প্রতিফলিত করে, যারা কেবল ব্যক্তিগত রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য মার্কিন জনগণের স্বার্থকে জিম্মি করেছে।

কিউবার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সতর্ক করেছে যে, এই আদেশ কার্যকর হলে দ্বীপরাষ্ট্রটির বিদ্যুৎ উৎপাদন, কৃষি ব্যবস্থা, পানি সরবরাহ এবং স্বাস্থ্যসেবা সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়তে পারে। কিউবা ইতিমধ্যে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ভেনেজুয়েলা থেকে জ্বালানি সরবরাহ কমে যাওয়ায় দেশটিতে দৈনিক লোডশেডিং এবং খাদ্য সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজ এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন এবং ‘ব্ল্যাকমেইল’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

ভেনেজুয়েলা প্রসঙ্গ ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

ট্রাম্পের এই হার্ডলাইন নীতির পেছনে কাজ করছে ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন। চলতি মাসের শুরুতে এক বিশেষ অভিযানে ক্ষমতাচ্যুত ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে মার্কিন সেনাবাহিনীর হাতে আটকের ঘটনায় ট্রাম্প প্রশাসন এখন দারুণ উজ্জীবিত। এক সময় ভেনেজুয়েলাই ছিল কিউবার প্রধান তেল ও অর্থ সরবরাহকারী। মাদুরোর পতনের ফলে সেই পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কিউবা এখন আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে। ট্রাম্পের ভাষ্যমতে, “কিউবা খুব শিগগিরই ভেঙে পড়বে” এবং এই শুল্ক আরোপের হুমকি সেই পতনকে আরও ত্বরান্বিত করবে।

মুক্ত বাণিজ্য বনাম জবরদস্তির রাজনীতি

ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে বারবার শুল্ক আরোপকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন। এর মাধ্যমে তিনি কেবল কিউবাকেই নয়, বরং বিশ্বের অন্যান্য তেল সরবরাহকারী দেশগুলোকেও একটি কড়া বার্তা দিয়েছেন। সমালোচকদের মতে, এটি মুক্ত বাণিজ্য বিধির পরিপন্থী এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যবাদী আচরণের বহিঃপ্রকাশ। তবে ট্রাম্পের সমর্থকদের দাবি, কিউবায় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং মার্কিন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এমন কঠোর পদক্ষেপের কোনো বিকল্প নেই।

এই নতুন শুল্ক ব্যবস্থার ফলে লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের সমীকরণ কোন দিকে মোড় নেয়, তা এখন বিশ্ব রাজনীতির বড় আলোচনার বিষয়।