নির্বাচনের আগে প্রবাসী আয়ে বড় লাফ: জানুয়ারিতে ২৯৪ কোটি ডলার

জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বইছে স্বস্তির হাওয়া। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অন্যতম প্রধান উৎস রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ে দেখা দিয়েছে অভাবনীয় গতি। চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম ২৮ দিনেই দেশে ২৯৪ কোটি ৩০ লাখ ডলারের সমপরিমাণ প্রবাসী আয় এসেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এই প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ৫০.৬ শতাংশ, যা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রবাসী আয়ের তুলনামূলক চিত্র ও প্রবৃদ্ধি

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরু থেকেই প্রবাসী আয়ের প্রবাহ ঊর্ধ্বমুখী। জুলাই থেকে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত সাত মাসে দেশে মোট ১ হাজার ৯২১ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই আয়ের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৫৭৩ কোটি ডলার। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে ২২ শতাংশ।

নিচে চলতি অর্থবছরের মাসভিত্তিক প্রবাসী আয়ের একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরা হলো:

মাস (২০২৫-২৬)প্রবাসী আয়ের পরিমাণ (মিলিয়ন ডলারে)
জুলাই২,৪৮০
আগস্ট২,৪২০
সেপ্টেম্বর২,৬৯০
অক্টোবর২,৫৬০
নভেম্বর২,৮৯০
ডিসেম্বর৩,২২০
জানুয়ারি (২৮ তারিখ পর্যন্ত)২,৯৪৩

নির্বাচন ও প্রবাসী আয়ের যোগসূত্র

ব্যাংকিং খাতের অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা মনে করছেন, সাধারণত ধর্মীয় উৎসব বা দুই ঈদের আগে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়লেও এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রার্থীরা তাঁদের নির্বাচনী ব্যয় মেটাতে বিদেশের তহবিল দেশে নিয়ে আসছেন। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও আমেরিকায় অবস্থানরত প্রবাসীরা নিজ নিজ পছন্দের প্রার্থীর সমর্থনে অর্থ পাঠাচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে প্রবাসীদের কাছ থেকে সংগৃহীত অনুদানও বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স হিসেবে দেশে প্রবেশ করছে। ধারণা করা হচ্ছে, নির্বাচনের আগ পর্যন্ত আয়ের এই ধারা অব্যাহত থাকবে।

রিজার্ভ পরিস্থিতি ও ডলারের বাজার স্থিতিশীলতা

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় ধরনের টান পড়েছিল। সে সময় মোট রিজার্ভ ছিল প্রায় ২৫.৫৮ বিলিয়ন ডলার। তবে প্রবাসী আয়ের উচ্চ প্রবৃদ্ধি এবং আমদানিতে কিছুটা লাগাম টানার ফলে বর্তমানে রিজার্ভ ৩২.২৬ বিলিয়ন ডলারে (৩ হাজার ২২৬ কোটি ডলার) উন্নীত হয়েছে। উল্লেখ্য যে, ২০২১ সালে দেশের রিজার্ভ রেকর্ড ৪৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও পরবর্তী সময়ে তা দ্রুত কমতে শুরু করেছিল।

প্রবাসী আয়ের এই উল্লম্ফন ডলারের বাজারেও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে এনেছে। এক সময় খোলা বাজারে ডলারের দাম ১২৮ টাকা পর্যন্ত উঠলেও বর্তমানে তা ১২২ থেকে ১২৩ টাকার মধ্যে লেনদেন হচ্ছে। ডলারের এই সরবরাহ বাড়ায় আমদানিকারকদের এলসি (LC) খোলা আগের চেয়ে সহজ হয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ও সম্ভাবনা

২০২৫ সালে মোট ৩ হাজার ২৮২ কোটি ডলারের রেকর্ড প্রবাসী আয় দেশে এসেছিল। চলতি অর্থবছরের বর্তমান গতিধারা বজায় থাকলে এই বছর আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংককে আর আগের মতো বাজার সামলাতে ডলার বিক্রি করতে হচ্ছে না, বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ডলার কিনে রিজার্ভ শক্তিশালী করছে।

প্রবাসী আয়ের এই জোয়ার দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিল্পায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে নির্বাচনী ডামাডোল শেষ হওয়ার পর এই প্রবাহ বজায় রাখা এবং হুন্ডির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ধরে রাখাই হবে আগামী দিনের প্রধান চ্যালেঞ্জ।