বুনো ঘোড়ায় চড়ে অস্ট্রেলিয়া পাড়ি দিলেন মার্কিন তরুণী

অজানাকে জানার নেশা আর অদম্য সাহসিকতা মানুষকে কত কঠিন পথ যে পাড়ি দিতে বাধ্য করে, তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন মার্কিন অশ্বারোহী জিন জ্যাগোলা। নিজের প্রিয় এবং বিশ্বস্ত সঙ্গী ‘ফ্যাবল’-এর পিঠে সওয়ার হয়ে অস্ট্রেলিয়ার দুর্গম পূর্ব উপকূল থেকে পশ্চিম উপকূল পর্যন্ত দীর্ঘ ৪,৪০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছেন ২৫ বছর বয়সী এই তরুণী। আধুনিক যুগের যান্ত্রিক বাহন ত্যাগ করে আদিম ও রোমাঞ্চকর এই যাত্রার মাধ্যমে তিনি কেবল একটি মহাদেশই অতিক্রম করেননি, বরং বুনো ঘোড়ার প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছেন।

অভিযানের শুরু ও লক্ষ্য

যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ার বাসিন্দা জিন জ্যাগোলা এর আগেও নিজ দেশে দীর্ঘ পথ ঘোড়ায় চড়ে পাড়ি দিয়েছেন। তবে অস্ট্রেলিয়ার ‘ব্রাম্বি’ বা বুনো ঘোড়ার কথা জানতে পেরে তিনি এক নতুন রোমাঞ্চের স্বাদ পেতে ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। অস্ট্রেলিয়ার প্রাকৃতিক পরিবেশে মুক্তভাবে বিচরণ করা এই ব্রাম্বি ঘোড়াদের বশ করা অত্যন্ত দুরূহ। জ্যাগোলা কোসচিউসকো ন্যাশনাল পার্কের একটি বুনো ঘোড়াকে ‘ভিক্টোরিয়ান ব্রাম্বি অ্যাসোসিয়েশন’-এর মাধ্যমে দত্তক নেন এবং নাম দেন ফ্যাবল। লক্ষ্য ছিল একটাই—এই বুনো ঘোড়াকে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাকে সঙ্গী করে পুরো অস্ট্রেলিয়া পাড়ি দেওয়া।

এক নজরে যাত্রার সংক্ষিপ্ত রূপরেখা

যাত্রার বিবরণবিস্তারিত তথ্য
অভিযাত্রীজিন জ্যাগোলা (২৫ বছর, মার্কিন নাগরিক)
সঙ্গী ঘোড়াফ্যাবল (বুনো ব্রাম্বি প্রজাতির ঘোড়া)
যাত্রার শুরুর স্থানট্যাথরা, নিউ সাউথ ওয়েলস (পূর্ব উপকূল)
যাত্রার সমাপ্তিস্থলবুসেলটন, ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া (পশ্চিম উপকূল)
মোট অতিক্রান্ত দূরত্ব৪,৪০০ কিলোমিটার (২,৭০০ মাইল)
যাত্রার স্থায়িত্বকালপ্রায় ৮ মাস (২০ মে থেকে যাত্রা শুরু)
দৈনিক গড় গতিসর্বোচ্চ ৩২ কিলোমিটার

প্রতিকূলতা ও ধৈর্যের পরীক্ষা

২০ মে নিউ সাউথ ওয়েলসের দক্ষিণ উপকূলীয় শহর ট্যাথরা থেকে এই যাত্রা শুরু হয়। জ্যাগোলার এই দীর্ঘ অভিযানে কোনো বিলাসিতা ছিল না। তিনি ভিক্টোরিয়া ও সাউথ অস্ট্রেলিয়া রাজ্যের উপকূলীয় রেখা ধরে নুলারবোর সমভূমি অতিক্রম করেন। নুলারবোর অঞ্চলটি বিশ্বের অন্যতম শুষ্ক ও দীর্ঘতম সরল সড়ক হিসেবে পরিচিত, যা প্রায় ১,২০০ কিলোমিটার বিস্তৃত। এই নির্জন পথে জ্যাগোলা এবং ফ্যাবল ছিলেন একে অপরের একমাত্র ছায়া সঙ্গী। রাতের বেলা কনকনে ঠান্ডা বা খোলা আকাশের নিচে সামান্য একটি তাঁবু ও স্যাডল ম্যাট বিছিয়ে ঘোড়ার পাশেই ঘুমিয়ে পড়তেন তিনি।

ঘোড়ার প্রতি মমত্ববোধ ও সুরক্ষা

জ্যাগোলা কেবল নিজের সাহসের ওপর নির্ভর করেননি, বরং তার ঘোড়া ফ্যাবলের স্বাস্থ্যের দিকেও তীক্ষ্ণ নজর রেখেছিলেন। তিনি বলেন, “ফ্যাবল কোনো যান্ত্রিক বাহন নয়, সে আমার রক্ত-মাংসের সঙ্গী।” তার এই মমত্ববোধের পরিচয় পাওয়া যায় ভ্রমণের ধরনে:

  • প্রতি এক ঘণ্টা ভ্রমণের পর অন্তত ১০ মিনিট বিরতি নেওয়া।

  • দিনের মোট পথের প্রায় ২৫ শতাংশ পথ জ্যাগোলা নিজে হেঁটে পার হতেন, যাতে ফ্যাবলের পিঠে বাড়তি চাপ না পড়ে।

  • ঘোড়ার ক্লান্তি দূর করতে নির্দিষ্ট সময় অন্তর বিরতি ও পর্যাপ্ত খাদ্যের ব্যবস্থা করা।

একটি সফল সমাপ্তি ও অনন্য অর্জন

দীর্ঘ আট মাসের কঠোর পরিশ্রম ও অনিশ্চয়তা শেষে জ্যাগোলা ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার পার্থ শহর থেকে ২০০ কিলোমিটার দক্ষিণে বুসেলটনের ফরেস্ট বিচে পৌঁছান। ২০ জানুয়ারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের সাফল্যের কথা জানিয়ে তিনি আবেগঘন এক বার্তা পোস্ট করেন। সেখানে তিনি নিজেকে অস্ট্রেলিয়ার এক উপকূল থেকে অন্য উপকূলে ঘোড়ায় চড়ে পাড়ি দেওয়া প্রথম ব্যক্তি হিসেবে দাবি করেন। বুনো ও অবাধ্য হিসেবে পরিচিত একটি ব্রাম্বিকে আপন করে নেওয়ার এই গল্প কেবল ভ্রমণের নয়, বরং মানুষ ও প্রাণীর মধ্যকার প্রগাঢ় বন্ধুত্বের এক অনুপম আখ্যান।

জিন জ্যাগোলা প্রমাণ করেছেন, সঠিক প্রশিক্ষণ আর গভীর ভালোবাসা থাকলে বুনো প্রাণীর সঙ্গেও অসাধ্য সাধন করা সম্ভব। তার এই জয়যাত্রা বিশ্বজুড়ে অ্যাডভেঞ্চার প্রেমীদের কাছে এক নতুন প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।