শেরপুরে সংঘর্ষের পর প্রশাসনিক প্রত্যাহার

শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলায় নির্বাচনী কার্যক্রম ঘিরে সহিংস সংঘর্ষে এক রাজনৈতিক নেতা নিহত হওয়ার ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসনের শীর্ষ দুই কর্মকর্তাকে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রত্যাহার হওয়া কর্মকর্তারা হলেন—ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আশরাফুল আলম এবং ঝিনাইগাতী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হাসান। বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশন ভবনে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ।

সিনিয়র সচিব বলেন, শেরপুরের ঘটনাটি নির্বাচনকালীন আচরণবিধির গুরুতর লঙ্ঘনের উদাহরণ। আচরণবিধি অনুযায়ী নির্বাচনী ইশতেহার পাঠ ও প্রচার কার্যক্রম শান্তিপূর্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও ঝিনাইগাতীতে তা নিশ্চিত করা যায়নি। কমিশনের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে প্রশাসনিক সমন্বয় ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় ঘাটতির বিষয়টি উঠে এসেছে। সে কারণেই তাৎক্ষণিকভাবে ইউএনও ও ওসিকে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট অ্যাডজুডিকেশন কমিটির কাছ থেকে বিস্তারিত প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে। প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর নির্বাচন কমিশন প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেবে। কমিশনের অবস্থান হলো—নির্বাচনী পরিবেশ বিঘ্নিত হলে দায় নিরূপণে কোনো ধরনের শৈথিল্য দেখানো হবে না।

এরই মধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ঝিনাইগাতীর ইউএনও আশরাফুল আলমকে প্রত্যাহার করে মন্ত্রণালয়ের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, তাঁকে আজকের মধ্যেই ঝিনাইগাতী উপজেলা থেকে দায়িত্ব ছাড়তে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দায়িত্ব হস্তান্তর না করলে তাঁকে তাৎক্ষণিক অবমুক্ত হিসেবে গণ্য করা হবে।

ঘটনার সূত্রপাত হয় বুধবার বিকেলে শেরপুর–৩ (শ্রীবরদী–ঝিনাইগাতী) সংসদীয় আসনে আয়োজিত এক নির্বাচনী ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে। ঝিনাইগাতী উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত ওই কর্মসূচিতে চেয়ারে বসা নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা–কর্মীদের মধ্যে প্রথমে বাকবিতণ্ডা এবং পরে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। সংঘর্ষে শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করিম গুরুতর আহত হন এবং পরে তিনি মারা যান। তিনি স্থানীয় ফতেহপুর ফাজিল মাদ্রাসার প্রভাষক ছিলেন। এ মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে হয়।

এদিকে, প্রবাসী ভোটারদের পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থাপনা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, আদালতের আদেশে যদি কোনো প্রার্থীর প্রার্থিতা বহাল বা পুনর্বহাল হয়, তবে ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত সেই প্রার্থীকে পোস্টাল ব্যালটে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে। তবে এর পর আদালতের রায়ে প্রার্থিতা ফিরে এলে তাকে পোস্টাল ব্যালটে যুক্ত করার সুযোগ থাকবে না। ব্যালট ছাপানো, বিতরণ এবং ফেরত আনার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

নির্বাচনী ব্যানার সংক্রান্ত আচরণবিধির ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, ব্যানারের নির্ধারিত আয়তন হবে ১০ ফুট বাই ৪ ফুট। ব্যানার অনুভূমিক না উল্লম্ব—সে বিতর্কে না গিয়ে নির্ধারিত আয়তনই বিবেচ্য হবে। সাধারণ ব্যানার সাদা–কালো হওয়া বাধ্যতামূলক; রঙিন ব্যানার বা পিভিসি ব্যবহার আচরণবিধির লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে এবং সে ক্ষেত্রে রিটার্নিং কর্মকর্তারা ব্যবস্থা নেবেন। তবে ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ডে রঙিন প্রচারণার অনুমোদন রয়েছে।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে নির্বাচন পর্যবেক্ষক আগমন প্রসঙ্গে আগের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে সিনিয়র সচিব বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকার স্পনসর করা কোনো পর্যবেক্ষক এই নির্বাচনে আসবেন না। তবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিভিন্ন স্বাধীন ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার পর্যবেক্ষকেরা আসতে পারেন।

নিচে ঘটনাসংশ্লিষ্ট মূল তথ্যগুলো সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো:

বিষয়তথ্য
ঘটনা স্থানঝিনাইগাতী উপজেলা, শেরপুর
নিহত ব্যক্তিমাওলানা রেজাউল করিম
নিহতের পরিচয়জামায়াত নেতা, মাদ্রাসা প্রভাষক
প্রত্যাহারকৃত কর্মকর্তাইউএনও আশরাফুল আলম, ওসি নাজমুল হাসান
প্রত্যাহারের কারণপ্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা
পোস্টাল ব্যালটের শেষ সময়৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

এই ঘটনার মাধ্যমে আবারও স্পষ্ট হলো—নির্বাচনী সময়ে প্রশাসনের দায়িত্বশীল ভূমিকা ও কঠোর নজরদারি ছাড়া শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করা কঠিন। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে তারা আরও কঠোর অবস্থান নেবে।