আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলীয় শৃঙ্খলার কঠোর বার্তা দিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। নোয়াখালী-২ (সেনবাগ ও সোনাইমুড়ীর আংশিক) আসনে দলীয় প্রার্থীর বিপক্ষে গিয়ে স্বতন্ত্র তথা ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেওয়ায় সেনবাগ উপজেলা ও পৌর বিএনপির ১৮ জন নেতা-কর্মীকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। আজ বুধবার বিকেলে নোয়াখালী জেলা বিএনপির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমকে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
বহিষ্কারের কারণ ও সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত
গত মঙ্গলবার রাতে বিএনপির কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এই বহিষ্কারের আদেশ জারি করা হয়। দলীয় সূত্রমতে, নোয়াখালী-২ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত করতে কাজ করার পরিবর্তে এই নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী কাজী মফিজুর রহমানের ‘কাপ-পিরিচ’ প্রতীকের পক্ষে জনসভা ও গণসংযোগে অংশ নিচ্ছিলেন। দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে বারবার সতর্ক করার পরেও তাঁরা এই কার্যক্রম অব্যাহত রাখায় কেন্দ্র থেকে এই কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মাহবুব আলমগীর এই তথ্য নিশ্চিত করে জানান, দলীয় প্রার্থীর স্বার্থ পরিপন্থী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকায় এবং কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত অমান্য করায় এই ১৮ জন নেতার প্রাথমিক সদস্যপদসহ সকল পর্যায়ের পদবী বাতিল করা হয়েছে।
বহিষ্কৃত নেতাদের তালিকা ও পদবী
বহিষ্কারের তালিকায় সেনবাগ উপজেলা ও পৌর বিএনপির বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার নাম রয়েছে। নিম্নে তাঁদের পরিচয় ও সাংগঠনিক অবস্থান তুলে ধরা হলো:
| ক্রমিক | নাম | দলীয় পদবী (বহিষ্কারের পূর্বে) |
| ০১ | জাহাঙ্গীর হোসেন চৌধুরী | যুগ্ম আহ্বায়ক, সেনবাগ উপজেলা বিএনপি |
| ০২ | নজরুল ইসলাম | যুগ্ম আহ্বায়ক, সেনবাগ উপজেলা বিএনপি |
| ০৩ | আবুল কালাম আজাদ | সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও সদস্য, উপজেলা বিএনপি |
| ০৪ | ওবায়দুল হক | সদস্য, উপজেলা বিএনপি |
| ০৫ | কামাল উদ্দিন | যুগ্ম আহ্বায়ক, সেনবাগ পৌর বিএনপি |
| ০৬ | রেজাউল হক | যুগ্ম আহ্বায়ক, সেনবাগ পৌর বিএনপি |
| ০৭ | তাজুল ইসলাম | যুগ্ম আহ্বায়ক, সেনবাগ পৌর বিএনপি |
| ০৮ | সাখাওয়াত উল্যাহ | স্থানীয় নেতা ও সমর্থক |
| ০৯ | মহিউদ্দিন | সদস্য, পৌর বিএনপি |
(বি.দ্র.: তালিকায় থাকা বাকি নেতারাও উপজেলা ও পৌর ইউনিটের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ছিলেন।)
বহিষ্কৃত নেতাদের প্রতিক্রিয়া ও নির্বাচনী মাঠের উত্তাপ
বহিষ্কারের এই সিদ্ধান্ত নির্বাচনী প্রচারণার মাঠে নতুন এক নাটকীয়তার জন্ম দিয়েছে। বহিষ্কৃত হওয়া নেতাদের অন্যতম, সেনবাগ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে গণমাধ্যমকে বলেন, “মাথাই যেখানে নেই, সেখানে টুপি দিয়ে কী হবে? আমার তো পদ-পদবি আগেই ছিল না। আমি বিএনপির একজন সাধারণ সমর্থক হিসেবে আমাদের প্রার্থীর কাপ-পিরিচ প্রতীকের পক্ষে কাজ করছি। আমরা সাধারণ কর্মীরা ঐক্যবদ্ধ এবং আমাদের প্রার্থীকে জয়ী করেই ঘরে ফিরব। সমর্থকদের বহিষ্কার করলে তো মাঠ পর্যায়ে দলই থাকে না।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সেনবাগ-সোনাইমুড়ী অঞ্চলের এই নির্বাচনী লড়াই এখন আক্ষরিক অর্থেই ‘বিএনপি বনাম বিদ্রোহী বিএনপি’র লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। একদিকে দলীয় প্রার্থীর সাংগঠনিক ভিত্তি, অন্যদিকে বহিষ্কৃত নেতাদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর শক্তিশালী অবস্থান—সব মিলিয়ে ভোটারদের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। দলের এই কঠোর অবস্থানে সাধারণ কর্মীদের মধ্যে কিছুটা ভীতি ছড়ালেও বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকরা তাঁদের কাজ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে এই কোন্দল নিরসন করা বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দলীয় প্রার্থীকে বিজয়ী করতে কেন্দ্র থেকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে।
