শোকাতুর পরিবেশে স্ত্রী-সন্তান হারানো ছাত্রলীগ নেতার কারাগার থেকে মুক্তি

স্ত্রী ও অবুঝ সন্তানের করুণ মৃত্যুর চার দিন পর অবশেষে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন বাগেরহাট সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি জুয়েল হাসান (সাদ্দাম)। আজ বুধবার বেলা দুইটার দিকে সকল আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। সিনিয়র জেল সুপার আসিফ উদ্দীন বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন। উল্লেখ্য যে, গত ২৩ জানুয়ারি জুয়েল হাসানের স্ত্রী ও নয় মাস বয়সী সন্তানের রহস্যজনক মৃত্যু হয়, যা নিয়ে সারা দেশে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছিল।

বিয়োগান্তক ঘটনা ও প্যারোলে মুক্তির আকুতি

গত ২৩ জানুয়ারি বাগেরহাট সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা গ্রামে সাদ্দামের নিজ বাড়ি থেকে তাঁর স্ত্রী কানিজ সুবর্ণা ওরফে স্বর্ণালির ঝুলন্ত মরদেহ এবং পাশেই তাঁর নয় মাস বয়সী শিশুসন্তান সেজাদ হাসানের নিথর দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সাদ্দাম তখন কারাগারে থাকায় এই মর্মান্তিক খবরটি তাঁর কাছে ছিল অসহনীয়। গত ২৪ জানুয়ারি স্বজনরা সাদ্দামকে শেষবারের মতো স্ত্রী-সন্তানের মুখ দেখার জন্য প্যারোলে মুক্তির আবেদন জানালেও তা মঞ্জুর হয়নি। ফলে এক আবেগঘন ও নজিরবিহীন পরিস্থিতিতে অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহ দুটি কারাগারের প্রধান ফটকে নিয়ে যাওয়া হয়। কর্তৃপক্ষের বিশেষ অনুমোদনে মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্য নিথর দেহ দুটি দেখার সুযোগ পান সাদ্দাম।

সাদ্দামের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন ও কারাবাসের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:

বিষয়বিবরণ
নাম ও পরিচয়জুয়েল হাসান (সাদ্দাম), সভাপতি, বাগেরহাট সদর উপজেলা ছাত্রলীগ।
গ্রেপ্তার ও স্থানান্তরের ইতিহাস২০২৫ সালের এপ্রিলে গোপালগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার; ১২ ডিসেম্বর যশোর কারাগারে স্থানান্তর।
মর্মান্তিক দুর্ঘটনা২৩ জানুয়ারি, ২০২৬: স্ত্রী ও সন্তানের মরদেহ উদ্ধার।
কারাফটকে মরদেহ দর্শন২৪ জানুয়ারি, ২০২৬ (মাত্র ৫ মিনিটের জন্য)।
হাইকোর্ট থেকে জামিনগত সোমবার (৬ মাস মেয়াদী জামিন)।
কারাগার থেকে চূড়ান্ত মুক্তি২৯ জানুয়ারি, ২০২৬ (বুধবার দুপুরে)।

মুক্তি ও শোকাতুর প্রত্যাবর্তন

উচ্চ আদালত থেকে ৬ মাসের জামিন লাভের পর আজ দুপুরে কারামুক্ত হন সাদ্দাম। মুক্তি পাওয়ার পর সন্ধ্যায় নিজ বাড়িতে পৌঁছে তিনি সোজা স্ত্রী ও সন্তানের কবরের পাশে চলে যান। সেখানে কবর জিয়ারতকালে সাদ্দাম কান্নায় ভেঙে পড়লে উপস্থিত জনতা ও স্বজনদের মাঝে এক শোকাতুর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। তাঁর ভাই শহিদুল ইসলাম জানান, প্রশাসনের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে কথা বলতে নিষেধ করা হয়েছে, তাই তাঁরা বর্তমানে কোনো বক্তব্য দিতে ইচ্ছুক নন।

কারা কর্তৃপক্ষের রহস্যজনক ভূমিকা ও বিতর্ক

সাদ্দামের মুক্তি নিয়ে আজ যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষের আচরণে গণমাধ্যমকর্মীরা চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। দুপুরের পর থেকে সাংবাদিকরা কারাফটকে অপেক্ষা করলেও কর্তৃপক্ষ মুক্তির বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য না দিয়ে ‘লুকোচুরি’ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার আসিফ উদ্দীন আইনি প্রক্রিয়া শেষে মুক্তির কথা স্বীকার করলেও কারাধ্যক্ষ আবিদ আহম্মেদ সাংবাদিকদের কোনো ফোন রিসিভ করেননি।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত বছরের এপ্রিলে সাদ্দাম গ্রেপ্তার হন। এরপর থেকে তিনি কারাগারে থাকলেও সম্প্রতি ঘটে যাওয়া এই পারিবারিক ট্র্যাজেডি মানবাধিকার এবং মানবিকতার প্রশ্নে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বর্তমানে সাদ্দাম নিজ গ্রামে অবস্থান করছেন এবং তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন সতর্ক রয়েছে।