সাবিনার পায়ে লেখা বাংলাদেশের নারী ফুটবলের প্রথম গল্প

সেই চিরচেনা হাসি, পরিচিত ভঙ্গিতে গোল উদ্‌যাপন, দুহাত ছড়িয়ে মাঠজুড়ে দাপট—ফুটবল হোক কিংবা ফুটসাল, সাবিনা খাতুন যেন একই গল্পের নাম। মাঠের আকার বদলায়, খেলোয়াড়ের সংখ্যা কমে-বাড়ে, নিয়মে আসে ভিন্নতা; কিন্তু সাবিনার আত্মবিশ্বাস, নেতৃত্ব আর গোল করার ক্ষুধা থাকে অবিচল। ২০২২ সালে সাফ নারী ফুটবলে ইতিহাস গড়া সেই সাবিনাকে যেমন দেখা গেছে, ঠিক তেমনই চার বছর পর সাফ উইমেন্স ফুটসালেও নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেছেন সাতক্ষীরার এই কৃতি ফুটবলার।

বাংলাদেশ নারী ফুটবল ও ফুটসালের ‘প্রথম’ শব্দটির সঙ্গে সাবিনার নাম যেন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে। সদ্য সমাপ্ত সাফ উইমেন্স ফুটসালের শেষ ম্যাচে মালদ্বীপকে ১৪–২ গোলের বিশাল ব্যবধানে হারিয়ে শিরোপা নিশ্চিত করে বাংলাদেশ। অধিনায়ক হিসেবে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন সাবিনা। পুরো টুর্নামেন্টে ১৪ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতার স্বীকৃতিও পান তিনি। নিয়মিত গোল করা তো বটেই, মাঠে সতীর্থদের সংগঠিত রাখা, গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দলকে উজ্জীবিত করাও ছিল তাঁর বড় অবদান।

বাংলাদেশ নারী ফুটবলের বড় অর্জন বলতে এখন পর্যন্ত দুবার সাফ জয় ও দক্ষিণ এশিয়ান গেমসে দুটি ব্রোঞ্জপদক। এই প্রতিটি সাফল্যের পাতায় পাতায় সাবিনার নাম লেখা। ২০২২ সালে নেপালে প্রথমবার সাফ নারী ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের সময় অধিনায়ক হিসেবে ৮ গোল করে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জেতেন তিনি। আরও আগে, ২০১০ দক্ষিণ এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের নারী ফুটবল দলের প্রথম পদক জয়ের পথেও তাঁর অবদান ছিল নির্ধারক। পাকিস্তানের বিপক্ষে সেই ম্যাচে ঢাকার স্টেডিয়ামে একমাত্র গোলটি করে দলকে ব্রোঞ্জপদক এনে দেন সাবিনা। একই আসরে নেপালের বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল বাংলাদেশের নারী দলের প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ—সেখানেও ছিলেন তিনি।

২০২৪ সালের অক্টোবরের পর জাতীয় ফুটবল দল থেকে বাইরে থাকলেও সাবিনার পথচলা থেমে থাকেনি। কোচ পিটার বাটলারের সঙ্গে মতবিরোধের পর দলে জায়গা না পেলেও ভুটান লিগে খেলেছেন, পরে ট্রায়ালের মাধ্যমে জায়গা করে নিয়েছেন নারী ফুটসাল জাতীয় দলে। সাফ ফুটসালে সেই প্রত্যাবর্তন রূপ নিয়েছে আরেকটি ইতিহাসে।

ফুটবল ও ফুটসাল—দুটি ভিন্ন ফরম্যাটেই দেশকে শিরোপা এনে দেওয়ায় সাবিনার প্রশংসা করেছেন বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল। তাঁর মতে, বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে এমন কীর্তি বিরল।

নিচের সারণিতে সাবিনা খাতুনের উল্লেখযোগ্য ‘প্রথম’ ও সাফল্যগুলো তুলে ধরা হলো:

বছরআসর/ফরম্যাটঅর্জনসাবিনার ভূমিকা
২০১০এসএ গেমস (ফুটবল)প্রথম আন্তর্জাতিক পদক (ব্রোঞ্জ)নির্ণায়ক গোল
২০১০আন্তর্জাতিক ম্যাচপ্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচদলের সদস্য
২০২২সাফ নারী ফুটবলপ্রথম শিরোপাঅধিনায়ক, ৮ গোল
২০২৪সাফ উইমেন্স ফুটসালপ্রথম শিরোপাঅধিনায়ক, ১৪ গোল

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর নতুন করে শুরু হওয়া নারী ফুটসালে মাত্র কয়েক মাসের প্রস্তুতিতেই সাফ জয়—এটি কেবল একটি শিরোপা নয়, বরং ভবিষ্যতের সম্ভাবনার ইঙ্গিত। আর সেই সম্ভাবনার কেন্দ্রে আছেন সাবিনা খাতুন। ফুটবল হোক বা ফুটসাল, বাংলাদেশের নারী ক্রীড়াঙ্গনে ‘প্রথম’-এর গল্প বললেই যাঁর নাম অনিবার্যভাবে উঠে আসে—তিনি সাবিনা।