সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ‘পিস বোর্ড’ বা শান্তি বোর্ডকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে তীব্র ভূরাজনৈতিক মেরুকরণ দেখা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ-পরবর্তী স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা ও গাজা পুনর্গঠনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র এই উদ্যোগকে একটি সাহসী কাঠামো হিসেবে তুলে ধরলেও, ঘোষণার পরপরই এর উদ্দেশ্য, কাঠামো ও বৈশ্বিক প্রভাব নিয়ে বিস্তর সন্দেহ ও প্রশ্ন উঠেছে।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ডাভোস সম্মেলনের ফাঁকে প্রস্তাবটি প্রকাশ করা হয়। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, আগামী ২২ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে বোর্ড গঠনের স্বাক্ষর অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ডাভোসে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলো যেখানে ব্যর্থ হয়েছে, সেখানে একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রই শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম। তাঁর বক্তব্য—“আমাদের ছাড়া বিশ্বের বড় একটি অংশ ঠিকভাবে কাজ করে না”—অনেক বিশ্লেষকের মতে যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক ও একতরফা বৈশ্বিক নেতৃত্বের ধারণাকেই আরও স্পষ্ট করেছে, যা সহযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পরিপন্থী।
প্রাথমিকভাবে জানানো হয়েছিল, জাতিসংঘের দুই বছরের তত্ত্বাবধানে গাজা পুনর্গঠনই হবে এই বোর্ডের মূল লক্ষ্য। কিন্তু ১১ পৃষ্ঠার খসড়া সনদে গাজার নাম পর্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। বরং এতে একটি বিস্তৃত আন্তর্জাতিক সংস্থার কথা বলা হয়েছে, যাকে রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক বিষয়ে ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হবে। সমালোচকদের প্রশ্ন—এই উদ্যোগ কি জাতিসংঘকে সহায়তা করবে, নাকি ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণে নতুন এক বৈশ্বিক কর্তৃত্বকেন্দ্র গড়ে তুলবে?
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকবেন এবং সব সিদ্ধান্তে তাঁর একক ভেটো ক্ষমতা থাকবে। নির্বাহী পরিষদে থাকার কথা রয়েছে জ্যারেড কুশনার, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের। বোর্ডের অধীনে দুটি প্রধান শাখা থাকবে—একটি বেসামরিক প্রশাসনিক কমিটি, যা গাজার শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করবে, এবং একটি সামরিক শাখা, যার নেতৃত্বে থাকবেন মার্কিন জেনারেল জ্যাসপার জেফার্স। সামরিক শাখার দায়িত্ব হবে স্থায়ী নিরস্ত্রীকরণ কার্যকর করা।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া স্পষ্টতই বিভক্ত। কিছু দেশ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করলেও, ইউরোপের একাধিক রাষ্ট্র আইনগত বৈধতা, জবাবদিহি ও ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। বিশেষভাবে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে ইসরায়েলের অংশগ্রহণ ঘিরে, কারণ দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে।
কিংস কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগের মতে, কিছু দেশের অংশগ্রহণ আদর্শিক সমর্থনের চেয়ে কৌশলগত সতর্কতার বহিঃপ্রকাশ। হোয়াইট হাউসের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বজায় রাখা এবং কূটনৈতিকভাবে একঘরে না হওয়ার তাগিদেই তারা এই পথে হাঁটতে পারে। অন্যদিকে, চীন ও রাশিয়ার নীরবতা ইঙ্গিত দিচ্ছে বিকল্প বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার নতুন প্রতিযোগিতার।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের শান্তি বোর্ড প্রকৃত অর্থে সংঘাত নিরসনের কার্যকর মাধ্যম হবে, নাকি কেবল সংকীর্ণ জাতীয় স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার—তা এখনও অনিশ্চিত। তবে এটি যে আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে তীব্র বিতর্ক উসকে দিয়েছে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।
শান্তি বোর্ডে দেশগুলোর অবস্থান
| অবস্থান | দেশসমূহ |
|---|---|
| অংশগ্রহণ নিশ্চিত | ইসরায়েল, পাকিস্তান, মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মরক্কো, সৌদি আরব, হাঙ্গেরি |
| অংশগ্রহণ প্রত্যাখ্যান | ফ্রান্স, ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন |
| সিদ্ধান্তহীন | ভারত, ইন্দোনেশিয়া, জাপান |
| আনুষ্ঠানিক অবস্থান নেই | চীন, রাশিয়া |
