বাংলাদেশের প্রশাসনিক ও সুশীল সমাজের এক অবিচল অভিভাবক, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান আর নেই। বুধবার (২১ জানুয়ারি, ২০২৬) সন্ধ্যাবেলা রাজধানীর উত্তরার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি পরলোকগমন করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণে দেশের সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে।
Table of Contents
বর্ণাঢ্য কর্মজীবন ও প্রশাসনিক সাফল্য
এম হাফিজ উদ্দিন খান ছিলেন কর্মজীবনে একজন ন্যায়নিষ্ঠ ও দক্ষ আমলা। তিনি সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ছিলেন। তাঁর মেধা ও যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে গেছেন প্রশাসনিক প্রতিটি স্তরে। ২০০১ সালে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা হিসেবে তিনি নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি বাংলাদেশের মহা-হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
একনজরে এম হাফিজ উদ্দিন খানের কর্মতালিকা:
| প্রতিষ্ঠানের নাম | পদবি ও ভূমিকা |
| তত্ত্বাবধায়ক সরকার (২০০১) | উপদেষ্টা (অর্থ, পরিকল্পনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়) |
| সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) | সভাপতি, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটি |
| টি আই বি (TIB) | সাবেক চেয়ারম্যান (ট্রাস্টি বোর্ড) |
| ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় | সাবেক সচিব |
| অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেড | সাবেক চেয়ারম্যান |
| বেসিক ও রূপালী ব্যাংক | সাবেক পরিচালক |
সুশাসন ও অধিকার আদায়ের আপসহীন কণ্ঠস্বর
চাকরি জীবন থেকে অবসরের পর হাফিজ উদ্দিন খান কেবল ঘরে বসে থাকেননি। তিনি হয়ে উঠেছিলেন নাগরিক অধিকার এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার এক জোরালো কণ্ঠস্বর। ‘সুশাসনের জন্য নাগরিক’ (সুজন)-এর সভাপতি হিসেবে তিনি দেশের নির্বাচনি সংস্কার ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা আনয়নে আজীবন কাজ করেছেন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর চেয়ারম্যান হিসেবেও তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর প্রতিটি বিশ্লেষণ ও মন্তব্য ছিল বস্তুনিষ্ঠ এবং দিকনির্দেশনামূলক।
ব্যক্তিগত জীবন ও শেষ বিদায়
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত ১৫ বছর ধরে তিনি উত্তরায় সস্ত্রীক নিভৃত জীবনযাপন করছিলেন। তাঁর দুই মেয়ে বর্তমানে কানাডায় অবস্থান করছেন। তাঁর মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীসহ বিভিন্ন স্তরের ব্যক্তিবর্গ গভীর শোক জানিয়েছেন। তাঁরা শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেছেন এবং তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছেন।
জানাজা ও দাফন প্রক্রিয়া
মরহুমের জানাজার সময় ও দাফনের স্থান সম্পর্কে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। তাঁর কানাডা প্রবাসী কন্যারা দেশে ফেরার পর পারিবারিকভাবে এই বিষয়ে ঘোষণা দেওয়া হবে। বর্তমানে তাঁর মরদেহ হাসপাতালের হিমাগারে সংরক্ষিত রয়েছে। স্বজনরা জানিয়েছেন, তাঁর জানাজা উত্তরা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে অনুষ্ঠিত হতে পারে।
উপসংহার
এম হাফিজ উদ্দিন খান তাঁর সততা এবং চারিত্রিক দৃঢ়তার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। কেবল সরকারি পদের জন্য নয়, বরং একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে দেশ ও জাতির কল্যাণে তাঁর অবদান কখনো বিস্মৃত হওয়ার নয়। সুশাসন ও স্বচ্ছতার পক্ষে তাঁর আজীবনের সংগ্রাম আগামী প্রজন্মের কাছে এক অনন্য পাথেয় হয়ে থাকবে।
