২০২৬ বিশ্বকাপ: টিকিট বিভ্রাট ও ট্রাম্পের অভিবাসন নীতি

২০২৬ সালের ১৯ জুলাই নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে যখন ফুটবলের বিশ্বসেরা মুকুট নির্ধারিত হবে, তখন সেটি কেবল একটি ম্যাচের জয়-পরাজয় থাকবে না; বরং তা হবে উত্তর আমেরিকার তিন দেশে ৪৪ দিন ধরে চলা এক মহাযজ্ঞের চূড়ান্ত সমাপ্তি। তবে টুর্নামেন্ট শুরুর ছয় মাস বাকি থাকতেই মাঠের ফুটবলের চেয়েও টিকিট বিক্রির বিতর্কিত নিয়ম এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে চরম অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। একদিকে আকাশচুম্বী দামের টিকিট, অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর ইমিগ্রেশন নীতি—সব মিলিয়ে ফুটবলের এই মিলনমেলা এক অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়েছে।

টিকিট বিতর্ক: ফিফার নতুন ব্যবসায়িক মডেল

এবারের বিশ্বকাপে ফিফা প্রথমবারের মতো ‘ডায়নামিক প্রাইসিং’ (Dynamic Pricing) পদ্ধতি চালু করেছে।1 এই পদ্ধতিতে চাহিদার ওপর ভিত্তি করে টিকিটের দাম বাড়ে। ফলে টিকিটের দাম সাধারণ ভক্তদের নাগালের বাইরে চলে গেছে। ফিফার তথ্য অনুযায়ী, চলমান তৃতীয় পর্যায়ে ইতোমধ্যে ২০ কোটির বেশি টিকিটের আবেদন জমা পড়েছে। তবে অভিযোগ উঠেছে যে, ২০২২ সালের তুলনায় এবার ফাইনালের টিকিটের দাম প্রায় নয় গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হলে ফিফা প্রতিটি ম্যাচে সীমিত সংখ্যক ‘ক্যাটাগরি-৪’ টিকিট ৬০ ডলারে বিক্রির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

 

ট্রাম্পের নীতি ও বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ও বিদেশনীতির কারণেও এবারের বিশ্বকাপ বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। বিশেষ করে ইরান, হাইতি এবং সেনেগালের মতো অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর নাগরিকদের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা (Travel Ban) জারি করায় ফুটবল ভক্তদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। এমনকি মানবাধিকার লঙ্ঘন ও রাজনৈতিক অস্থিরতার অজুহাতে প্রায় ১৭ হাজার ভক্ত ইতোমধ্যে তাদের টিকিটের আবেদন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। এছাড়া ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ২৩ জন সদস্য যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বকাপ থেকে বহিষ্কারের দাবি তুলেছেন, যা বিশ্ব ফুটবলের জন্য এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

২০২৬ বিশ্বকাপের প্রধান প্রতিবন্ধকতা ও বর্তমান পরিস্থিতি:

প্রধান বিষয়বিস্তারিত তথ্য ও বর্তমান অবস্থা
টিকিট মূল্যসর্বনিম্ন ৬০ ডলার থেকে শুরু করে ফাইনালের টিকিট ৪,০০০ ডলার পর্যন্ত।
নতুন নিয়ম‘ডায়নামিক প্রাইসিং’ এবং টিকিটের জন্য বিএমইটি ছাড়পত্রের শর্ত।
ভ্রমণ বাধাইরান, হাইতি, নাইজেরিয়া ও সেনেগালের ভক্তদের জন্য ভিসা জটিলতা।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবট্রাম্পের ‘ফিফা পাস’ ভিসা সিস্টেম চালুর প্রতিশ্রুতি।
বাংলাদেশের কোটানন-প্লেয়িং কান্ট্রি হিসেবে বাফুফে পাচ্ছে ৩৩০টি টিকিট।
যাতায়াত দূরত্বটরন্টো থেকে লস অ্যাঞ্জেলেস পর্যন্ত প্রায় ৩,১০০ মাইল।
নজিরবিহীন ঘটনা১৭ হাজার ভক্তের স্বেচ্ছায় টিকিটের আবেদন প্রত্যাহার।

যাতায়াত ও অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ

তিনটি ভিন্ন দেশে (যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা) ১৬টি শহরে খেলা হওয়ার কারণে যাতায়াত হবে অন্যতম বড় বাধা। ইউরোপ বা এশিয়ার দর্শকদের জন্য উত্তর আমেরিকার শহরগুলোর মধ্যে বিমানের টিকিট এবং হোটেলের ভাড়া কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। অনেক ভক্তই অভিযোগ করছেন যে, পাবলিক ট্রান্সপোর্টের অভাব এবং বিশাল দূরত্বের কারণে এক শহর থেকে অন্য শহরে গিয়ে খেলা দেখা সাধারণ মানুষের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়বে।

উপসংহার

২০২৬ বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে ইতিহাসের বৃহত্তম ৪৮ দলের আসর। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চমূল্যের টিকিট এবং ভিসা সংক্রান্ত কড়াকড়ি এই আসরের ‘বিশ্বজনীন’ আমেজকে ম্লান করে দিচ্ছে। ফুটবলপ্রেমীরা এখন কেবল মাঠের লড়াইয়ের জন্য নয়, বরং একটি হয়রানিমুক্ত ও সহজসাধ্য বিশ্বকাপ অভিজ্ঞতার অপেক্ষায় দিন গুনছেন।