নারী ভোটারকে ক্ষমতা, নারী নেতৃত্বে বাঁধা—এ কি গণতন্ত্র?

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইতিহাসে নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ সর্বদা গুরুত্বপূর্ণ ও উল্লেখযোগ্য। নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেকই নারী, এবং কিছু নির্বাচনী এলাকার নারী ভোটার সংখ্যা পুরুষ ভোটারের চেয়েও বেশি। তবে এই বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে, নিবন্ধিত ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩০টি দল একটিও নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেয়নি। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে একটি কাঠামোগত ও লজ্জাজনক বৈষম্যের প্রতিফলন।

বিশেষভাবে, ইসলামী দলে এই নারীশূন্য রাজনীতির প্রবণতা দৃশ্যমান। নিম্নে কয়েকটি ইসলামী দলের নারী প্রার্থী মনোনয়ন সংক্রান্ত তথ্য দেওয়া হলো:

দলমোট প্রার্থীনারী প্রার্থীমন্তব্য
জামায়াতে ইসলামী২৭৬একটিও নারী প্রার্থী নেই
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ২৬৮নারী নেতৃত্বের দরজা বন্ধ
খেলাফত মজলিস১৫০নারী প্রার্থী নেই
বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট১২৩নারী নেতৃত্বকে অগ্রাহ্য করেছে

এটি কোনো দুর্ঘটনাজনিত ঘটনা নয়; বরং এটি একটি সচেতন, পরিকল্পিত ও কাঠামোগত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, যা নারীদের রাষ্ট্র পরিচালনার সাংবিধানিক অধিকারকে effectively অস্বীকার করে।

বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদ নারী-পুরুষ সমতার অধিকার নিশ্চিত করেছে। এছাড়া সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা রয়েছে, যা রাজনৈতিক ক্ষমতায় নারীর অংশগ্রহণের অপরিহার্যতা নির্দেশ করে। তবে যেসব দল নারী প্রার্থী দেয় না, তারা কার্যত ঘোষণা দেয় যে—“নারীরা রাষ্ট্র পরিচালনার যোগ্য নয়।” এটি সংবিধান ও গণতন্ত্রের মূল ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

ধর্মের আড়ালে এই বৈষম্যকে বৈধ হিসেবে উপস্থাপন করার প্রচেষ্টা প্রায়শই লক্ষ্য করা যায়। যদিও ইসলামের ইতিহাসে নারীরা শিক্ষা, প্রশাসন, ব্যবসা ও সমাজ সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব থেকে তাদের বাদ দেওয়ার কোনো ধর্মীয় নির্দেশনা নেই। এটি পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক কাঠামো টিকিয়ে রাখার একটি কৌশল মাত্র।

নারী ভোট গ্রহণযোগ্য, কিন্তু নেতৃত্ব অগ্রহণযোগ্য—এই দ্বিচারিতা কেবল নারীর অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করে না, বরং দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতকেও হুমকির মুখে ফেলে। শ্রমজীবী নারী, উদ্যোক্তা, কৃষক, পোশাকশ্রমিক ও অন্যান্য পেশাজীবী নারীদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হচ্ছে যে, এমন দল ক্ষমতায় এলে নারীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও নাগরিক অধিকার কতটা সুরক্ষিত থাকবে।

সংক্ষেপে, নারীশূন্য রাজনীতি কেবল নারীর ক্ষমতায়নকে হ্রাস করে না; এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্র, সংবিধান এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎকেও গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তাই নারীর রাজনৈতিক নেতৃত্বকে স্বাভাবিক করা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এখন একমাত্র যৌক্তিক ও নৈতিক দাবি।

লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক
খবরওয়ালা / জি-লাইভ