বিদ্রোহী প্রার্থী সামলাতে বিপাকে বিএনপি নেতৃত্ব

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা দিলেও বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বারবার সতর্কবার্তা, বৈঠক ও নির্দেশনার পরও দলের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নেতা স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় থাকায় দলটির ভেতরে অস্বস্তি ও উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে।

দলীয় অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, সারা দেশে প্রায় ২০০ জন বিদ্রোহী প্রার্থী এখনো মাঠে রয়েছেন। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র চারজন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন বা নির্বাচন কমিশনে আবেদন করেছেন। তবে শীর্ষ নেতারা আশাবাদী, প্রার্থিতা প্রত্যাহারের চূড়ান্ত সময়সীমা ২০ জানুয়ারির আগেই আরও অনেকে দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে সরে দাঁড়াবেন এবং মনোনীত প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করবেন।

বিদ্রোহী প্রার্থীর এই বিপুল উপস্থিতি ইতোমধ্যে দলীয় কোন্দল বাড়িয়েছে। এতে শুধু বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো নয়, বরং নির্বাচনী জোটের শরিক দলগুলোর মধ্যেও অস্বস্তি সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে একাধিক প্রার্থীর মাঠে থাকা বিএনপির ভোটব্যাংককে বিভক্ত করতে পারে, যা অনেক আসনে বিরোধী প্রার্থীদের জন্য অপ্রত্যাশিত সুযোগ তৈরি করবে।

দলীয় নির্দেশনা অমান্য করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অভিযোগে বিএনপি ইতোমধ্যে ১০ জন নেতাকে বহিষ্কার করেছে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর মহানগর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নীরব অন্যতম। তবু বহিষ্কার ও সতর্কবার্তার পরও পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি।

মনোনয়নপত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঢাকার বাইরে ৬৩টি জেলায় ১১৮টি আসনে প্রায় ১৭৯ জন বিএনপি নেতা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। কিছু আসনে বিএনপি ইচ্ছাকৃতভাবে প্রার্থী দেয়নি, জোটের শরিকদের জন্য জায়গা ছেড়ে দিয়েছে। যেমন—ঢাকা-১২ আসন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকের জন্য এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের প্রার্থীর জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু এসব আসনেও দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে বিএনপির নেতারা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন।

তারেক রহমানের সরাসরি হস্তক্ষেপ

বিদ্রোহী প্রার্থীদের সরাতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজে হস্তক্ষেপ শুরু করেছেন। গত ৯ জানুয়ারি সুনামগঞ্জ-৫ আসনের বিদ্রোহী প্রার্থী ও নির্বাহী কমিটির সদস্য মিজানুর রহমান চৌধুরী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের পর নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। একইভাবে নোয়াখালী-৫ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী হাসনা জসীমউদ্দিন মওদুদ এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনের আব্দুল খালেকও তারেক রহমানের নির্দেশে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন।

তবে কিছু বিদ্রোহী নেতা, যেমন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে রুমিন ফারহানা, দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে নির্বাচন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন, যা নেতৃত্বের জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিদ্রোহী প্রার্থীদের বর্তমান চিত্র

বিষয়তথ্য
মোট বিদ্রোহী প্রার্থীপ্রায় ২০০
প্রার্থিতা প্রত্যাহার৪ জন
বহিষ্কৃত নেতা১০ জন
মনোনয়ন জমা (ঢাকার বাইরে)১৭৯ জন
চূড়ান্ত প্রত্যাহারের সময়২০ জানুয়ারি

দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা জানিয়েছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যারা প্রার্থিতা প্রত্যাহার করবেন না, তাদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, বিদ্রোহী প্রার্থীদের এই স্রোত থামানো না গেলে নির্বাচনী মাঠে বিএনপির কৌশল ও সম্ভাবনা দুটোই বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।