বাংলাদেশে বৈধভাবে বিদেশগমনের ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে মূল দায় রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর কার্যক্রম। অবৈধভাবে বিদেশ যাওয়া, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দেশে না ফেরা, নথি জালিয়াতি করে বিদেশগমন—এসব বিষয় বর্তমানে দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। কিছু রিক্রুটিং এজেন্সি মানবপাচার, প্রতারণা ও অর্থনৈতিক অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে।
পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এই খাতে সবচেয়ে বেশি অনিয়মের খবর পাওয়া গিয়েছিল। ওই সময়কালীন অর্থমন্ত্রীসহ কয়েকজন মন্ত্রীর নামও অভিযোগে এসেছে। ফলশ্রুতিতে বৈধ পথে বিদেশগমন ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সুশাসন ফিরিয়ে আনার আশা করা হলেও তা সেভাবে ফলপ্রসূ হয়নি। বরং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের নেতৃত্বে নতুন করে ২৫২টি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে।
প্রবাসী রেমিট্যান্সের তুলনায় দেখা যায়, বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। ২০২৫ সালে ভারতের প্রবাসীরা রেমিট্যান্স হিসেবে ১৩৫ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছে, যেখানে বাংলাদেশ পেয়েছে মাত্র ৩১ বিলিয়ন ডলার।
দক্ষিণ এশিয়ার রিক্রুটিং এজেন্সি সংখ্যা নিম্নরূপ:
| দেশ | রিক্রুটিং এজেন্সি সংখ্যা | মন্তব্য |
|---|---|---|
| বাংলাদেশ | ২,৬৪৬ | সর্বাধিক দক্ষিণ এশিয়ায় |
| ভারত | ১,৯৮৮ | |
| পাকিস্তান | ২,৫৪৫ | |
| নেপাল | ১,০৪১ | |
| শ্রীলঙ্কা | ৮৫৭ | |
| ভুটান | ৩১ | সক্রিয় এজেন্সি মাত্র ৪ |
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এজেন্সির সংখ্যা কমানো না হলে মানবপাচার, প্রতারণা ও দালালদৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। গত এক দশকে প্রায় ১৩ লাখ ৫০০ কোটি টাকা হুন্ডিতে বিদেশে প্রেরণ করা হয়েছে।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ১১,৩১,১১৩ জন প্রবাসী শ্রমিক বিদেশে গেছেন। এর মধ্যে ৭,৫৪,৬২৯ জন সৌদি আরব গেছেন। তবে ইউরোপে অনিয়মিত পথে প্রবেশকারীর সংখ্যা বেড়ে ২২,১৪৫ জন হয়েছে। মানবপাচারের মামলাও ভয়াবহ। ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ৪,৫৪৬টি মামলা দায়ের হয়েছে, আসামি ১৯,২৮০ জন। বিচার শেষে মাত্র ১৫৭ জন সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন লাইসেন্স অনুমোদন দেশে শ্রম বাজারে দুই ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। ইতিবাচক দিক হলো, নতুন এজেন্সি বৈধ কাঠামোর মধ্যে কাজ করবে। নেতিবাচক দিক হলো অনিয়মের পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা। তাই সকল এজেন্সির কার্যকারিতা মূল্যায়ন ও তদারকি জোরদার করা অপরিহার্য।
সিনিয়র সচিব ড. নেয়ামত উল্যা ভূঁইয়া জানান, “লাইসেন্স দেওয়া রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, সরকারি কর্মচারীরা নীতি বাস্তবায়ন করেন। অসাধুদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।” অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রিক্রুটিং এজেন্সি ও সাব-এজেন্ট নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়ের সমন্বয় অপরিহার্য। লাইসেন্স বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়; দক্ষ শ্রমিকদের বৈধভাবে বিদেশ পাঠানো এবং প্রবাসীদের অধিকার সুরক্ষিত রাখতে কার্যকর তদারকি জরুরি।
