আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মাঠ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বুধবার (৭ জানুয়ারি, ২০২৬) প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে এক জরুরি বৈঠকে বসে দলটির একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল। বৈঠকে জামায়াতের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, লটারি পদ্ধতিতে নিয়োগ পাওয়া অনেক পুলিশ সুপার (এসপি) এবং বর্তমানে কর্মরত জেলা প্রশাসকরা (ডিসি) নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের স্বার্থে কাজ করছেন। সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের স্বার্থে এসব ‘দলীয়’ কর্মকর্তাদের অবিলম্বে অপসারণ করে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের পদায়নের দাবি জানিয়েছে দলটি।
লটারি পদ্ধতি ও জামায়াতের অবস্থানের পরিবর্তন
তফসিল ঘোষণার পূর্বে গত নভেম্বর মাসে জামায়াতের পক্ষ থেকেই মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের লটারির মাধ্যমে বদলির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। দলটির তৎকালীন যুক্তি ছিল, এর ফলে পদায়নে কোনো পক্ষপাত থাকবে না। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পরবর্তীতে কয়েকটি জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) নিয়োগের ক্ষেত্রে লটারি পদ্ধতি অনুসরণ করে। তবে বুধবারের বৈঠকে জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের অভিযোগ করেন, লটারির মাধ্যমে আসা কর্মকর্তাদের মধ্যে অনেকেই রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত এবং তাঁদের কর্মকাণ্ডে নিরপেক্ষতা দৃশ্যমান নয়। বিশেষ করে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) ক্ষেত্রে লটারি পদ্ধতি ব্যবহৃত না হওয়ায় তাঁদের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে জামায়াত।
নির্বাচন কমিশন ও মাঠ প্রশাসনের বর্তমান পরিস্থিতি এবং জামায়াতের প্রধান দাবিগুলো নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো:
নির্বাচনকালীন মাঠ প্রশাসন ও জামায়াতের আপত্তিসমূহ
| বিষয়ের ক্ষেত্র | বিস্তারিত বিবরণ ও অভিযোগ |
| নির্বাচনের তারিখ | ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন)। |
| মাঠ প্রশাসনের পদ | জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপার (এসপি)। |
| অভিযোগের ধরণ | লটারি ও স্বাভাবিক পদ্ধতিতে নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে ‘দলীয়’ প্রভাব। |
| বৈষম্যের উদাহরণ | মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইকালে একই অভিযোগে ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত। |
| নিরাপত্তা ব্যবস্থা | প্রার্থীদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বৈষম্য (কাউকে অতিরিক্ত, কাউকে পর্যাপ্ত নয়)। |
| প্রধান দাবি | নিরপেক্ষ ও পেশাদার কর্মকর্তাদের মাধ্যমে প্রশাসন ঢেলে সাজানো। |
লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ও প্রচারণায় বাধা
সিইসির সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, “ভোটের আর মাত্র এক মাস বাকি থাকলেও দেশে এখনো নির্বাচনের জন্য সমান সুযোগ বা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত হয়নি।” তিনি অভিযোগ করেন, একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থা থেকে ব্যাপক প্রচারণার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, অথচ অন্যান্য দলগুলো বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। এই বৈষম্যের কথা তিনি ব্যক্তিগতভাবে তথ্য উপদেষ্টাকে টেলিফোনে জানিয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন।
মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া নিয়েও জামায়াত নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁদের দাবি, রিটার্নিং কর্মকর্তারা বিভিন্ন স্থানে একই ধরণের তথ্যের ভিত্তিতে কোনো প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ করেছেন, আবার অন্যেরটি বাতিল করেছেন। প্রশাসনের এই দ্বিমুখী আচরণ নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতাকে হুমকির মুখে ফেলছে।
গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী প্রথম নির্বাচনের চ্যালেঞ্জ
জামায়াত নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর এটিই দেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। এই নির্বাচন যদি কোনোভাবে ‘সাজানো’ বা অগ্রহণযোগ্য হয়, তবে দেশ গভীর অস্তিত্বের সংকটে পড়বে। তাই নির্বাচন কমিশনকে কেবল রুটিন মাফিক কাজ না করে শক্ত হাতে মাঠ প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করার আহ্বান জানিয়েছে দলটি। তাঁরা মনে করেন, ডিসি ও এসপিরা যদি নিরপেক্ষ না হন, তবে ভোটের দিন ভোটারদের নিরাপত্তা ও ভোটের সঠিক প্রতিফলন নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
