সেন্ট মার্টিন রক্ষায় প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার: সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান

বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনকে কেন্দ্র করে সরকারের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা ও পরিবেশগত উদ্বেগের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন তথ্য ও পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের জন্য প্রণীত ‘মাস্টারপ্ল্যান’ সংক্রান্ত এক বিশেষ কর্মশালায় তিনি প্রধান অতিথির বক্তব্যে তাঁর সুনির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেন, “সেন্ট মার্টিনকে বাঁচানোর জন্য যতই বিশদ মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করা হোক না কেন, তা বাস্তবায়নে শক্তিশালী রাজনৈতিক অঙ্গীকার না থাকলে কোনো সুফল আসবে না।”

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান মনে করেন, পর্যটনকে কেবল মুনাফা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখলে সেন্ট মার্টিনকে রক্ষা করা অসম্ভব। তিনি বলেন, “ট্যুরিজম আর সেন্ট মার্টিন এক জিনিস নয়। আমাদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত দ্বীপটিকে তার পূর্বের আদি ও প্রাকৃতিক অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া।” তিনি উদাহরণ টেনে বলেন যে, বিশ্বের অনেক দেশে এমন সংবেদনশীল প্রবাল দ্বীপে পর্যটকদের রাতযাপন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, কারণ প্রকৃতির নিজস্ব পুনর্গঠনের জন্য নির্জনতা প্রয়োজন।

দ্বীপটির অস্তিত্ব রক্ষায় উপদেষ্টা যে বিষয়গুলোর ওপর জোর দিয়েছেন, তা নিচের সারণিতে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

সেন্ট মার্টিন দ্বীপ রক্ষা ও মাস্টারপ্ল্যানের প্রধান স্তম্ভসমূহ

বিষয়ের ক্ষেত্রবিস্তারিত কৌশল ও দৃষ্টিভঙ্গি
প্রাথমিক অগ্রাধিকারপ্রথমে পরিবেশ সংরক্ষণ, এরপর অর্থনীতি এবং সবশেষে পর্যটন।
বাণিজ্যিক কাঠামোবহিরাগতদের বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণ বন্ধ করে স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করা।
টেকসই আবাসনবড় হোটেল-রিসোর্টের বিকল্প হিসেবে স্থানীয়দের বাড়িতে ‘হোম-স্টে’ ব্যবস্থা।
আচরণগত বিধিনিষেধবারবিকিউ পার্টি ও লাউডস্পিকারের মতো উচ্চ শব্দ সৃষ্টিকারী কাজ নিষিদ্ধ।
বিকল্প কর্মসংস্থানকৃষি ও মৎস্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দ্বীপবাসীর জন্য টেকসই আয়ের উৎস।
সরকারি নজরদারিদ্বীপের ভাঙন রোধ এবং প্রবাল প্রাচীর সংরক্ষণে নিবিড় পর্যবেক্ষণ।

পরিবেশ উপদেষ্টা তাঁর বক্তব্যে সেন্ট মার্টিনকে ‘পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা’ (ECA) হিসেবে উল্লেখ করে দ্বীপের ভঙ্গুর অবস্থার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি জানান, দ্বীপের বর্তমান দূষণ ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের মূল কারণ হলো অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক কার্যক্রম এবং বহিরাগতদের দ্বারা পরিচালিত পর্যটন কেন্দ্রগুলো। তাঁর মতে, পর্যটন ব্যবস্থা হতে হবে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে, যাতে দ্বীপের পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব স্থানীয়রাই নিজেদের কাঁধে তুলে নিতে পারেন।

তিনি আরও জানান যে, সেন্ট মার্টিন রক্ষায় প্রস্তাবিত পাঁচটি মাস্টারপ্ল্যান ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে সরকার। তবে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সফল করতে কেবল পরিবেশ মন্ত্রণালয় নয়, বরং কৃষি, মৎস্য ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। উপদেষ্টা পর্যটকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, সেন্ট মার্টিন কোনো সাধারণ আনন্দ ভ্রমণের জায়গা নয়, এটি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ইকোসিস্টেম। তাই সেখানে গিয়ে বারবিকিউ করা বা উচ্চ শব্দে গান বাজানো দ্বীপের জীববৈচিত্র্যের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ। দ্বীপের ভাঙন ও সংরক্ষণ নিয়ে বর্তমানে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে নিয়মিত নজরদারি করা হচ্ছে বলেও তিনি নিশ্চিত করেন।