বাংলা কথাসাহিত্যের আকাশে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এক উজ্জ্বল ও ব্যতিক্রমী নক্ষত্র। সমাজবাস্তবতা, ইতিহাসচেতনা এবং মানুষের অন্তর্গত দ্বন্দ্বকে শিল্পসম্মত ভাষায় রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অনন্য। তাঁর স্বকীয় বর্ণনারীতি, জীবন্ত সংলাপ এবং সমাজ-রাজনীতি-ব্যক্তিগত সংকটের নিখুঁত চিত্রায়ণ বাংলা কথাসাহিত্যে তাঁকে এক স্বতন্ত্র উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
জীবন ও শিক্ষা
আখতারুজ্জামান মুহম্মদ ইলিয়াস জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি গাইবান্ধার গোটিয়া গ্রামে, তবে পৈতৃক নিবাস ছিল বগুড়া জেলার চেলোপাড়ায়। তাঁর পিতা বদিউজ্জামান মুহম্মদ ইলিয়াস ছিলেন পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য ও মুসলিম লীগের পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি। পিতার রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক সচেতনতা লেখকের জীবনচেতনায় গভীর প্রভাব ফেলে।
শিক্ষাজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত কৃতী। ১৯৫৮ সালে বগুড়া জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন, ১৯৬০ সালে ঢাকা কলেজ থেকে আইএ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৩ সালে বিএ (অনার্স) ও ১৯৬৪ সালে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন।
কর্মজীবন
শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার পর ঢাকার জগন্নাথ কলেজে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং ১৯৮৩ পর্যন্ত অধ্যাপনা করেন। পরবর্তীতে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক, সঙ্গীত মহাবিদ্যালয়ের উপাধ্যক্ষ, মফিজউদ্দীন শিক্ষা কমিশনের বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা কলেজে অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সাহিত্যকর্ম ও স্বীকৃতি
ইলিয়াসের সাহিত্যচেতনা প্রগতিশীল, মানবতাবাদী এবং রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রতি সুস্পষ্ট সহমর্মিতার পরিচায়ক। তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছেন সমাজের অন্তর্গত টানাপোড়েন, ক্ষমতার রাজনীতি, ইতিহাস ও ব্যক্তিগত সংকটকে শিল্পসম্মত ভাষায় উপস্থাপনের জন্য।
নিচের টেবিলে তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা ও অর্জিত পুরস্কার প্রদর্শন করা হলো:
| গ্রন্থ / সাহিত্যকর্ম | প্রকাশ / অর্জিত পুরস্কার | উল্লেখযোগ্য তথ্য |
|---|---|---|
| অন্যঘরে অন্যস্বর | – | সমাজ ও রাজনৈতিক সংকটের চিত্রায়ণ |
| খোঁয়ারি | – | জীবনের বাস্তবধর্মী উপস্থাপনা |
| দুধভাতে উৎপাত | – | সামাজিক বন্ধন ও দ্বন্দ্বের উপস্থাপনা |
| চিলেকোঠার সেপাই | – | নাট্যরূপে মঞ্চস্থ, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি |
| দোজখের ওম | – | ব্যাক্তিগত ও সামাজিক দ্বন্দ্ব |
| খোয়াবনামা | পান সাদত আলী আখন্দ পুরস্কার (১৯৯৫), আনন্দ পুরস্কার (১৯৯৬) | কলকাতা ও বাংলাদেশে স্বীকৃতি |
| সংস্কৃতির ভাঙা সেতু | – | সংস্কৃতির সংকট ও সামাজিক বিশ্লেষণ |
বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৮২) তার সাহিত্য অবদানের প্রমাণ। তার রচনাগুলো ভারতীয় বিভিন্ন ভাষা ও বিদেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। চিলেকোঠার সেপাই উপন্যাসটি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক বাংলা সাহিত্য পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়।
ব্যক্তিজীবন ও উত্তরাধিকার
তিনি ছিলেন নিভৃতচারী; একমাত্র পুত্র আন্দালিব ইলিয়াস পার্থ বর্তমানে কলকাতায় বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বাংলা সাহিত্যকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়া এই মহীরুহ কথাসাহিত্যিক ১৯৯৭ সালের ৪ জানুয়ারি ঢাকায় ইহলোক ত্যাগ করেন। পরবর্তীকালে তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করা হয়—যা তাঁর সাহিত্যকীর্তির রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি।
শ্রদ্ধা ও গভীর স্মরণে—
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
