বিজয় নিশান ওড়াতে পলাশীতে গঠিত ‘সুইসাইড স্কোয়াড’

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পরাজয় ত্বরান্বিত করতে নৌ-কমান্ডোদের পরিচালিত জলপথের অভিযানগুলো ছিল ইতিহাসের অন্যতম দুঃসাহসী অধ্যায়। ‘অপারেশন জ্যাকপট’ ও ‘অপারেশন হটপ্যান্টস’-এর মতো ধ্বংসাত্মক আক্রমণগুলো শত্রুপক্ষকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে দিয়েছিল। এই দুর্ধর্ষ অভিযানের নেপথ্যে থাকা বীর যোদ্ধাদের প্রশিক্ষিত করা হয়েছিল ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার ভাগীরথী নদীর তীরে। পলাশীর সেই ঐতিহাসিক প্রান্তর, যেখানে একদা বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল, ঠিক সেখানেই একাত্তরে বাংলার দামাল ছেলেরা শপথ নিয়েছিলেন দেশকে স্বাধীন করার।

প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের গঠন ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

ভাগীরথী নদীর তীরের এই ক্যাম্পটি ছিল অত্যন্ত সুরক্ষিত ও গোপন। ভারতীয় নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কমান্ডার জি এম মার্টিস এই ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন। মূলত নদীমাতৃক পূর্ব বাংলার যে তরুণরা সাঁতারে পারদর্শী, তাদের মধ্য থেকেই নৌ-কমান্ডো বাছাই করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ হলের ছাত্র থেকে শুরু করে সাধারণ খেটে খাওয়া সাহসী যুবকদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল এই বিশেষ বাহিনী।

নিচে নৌ-কমান্ডোদের প্রশিক্ষণ ও গঠন সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাবলি সারণি আকারে দেওয়া হলো:

নৌ-কমান্ডো প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের বিস্তারিত চিত্র

ক্যাটাগরিতথ্য ও বিবরণ
ক্যাম্পের অবস্থানপলাশীর ঐতিহাসিক আম্রকানন, ভাগীরথী নদীর পাড়।
প্রশিক্ষণকালমে থেকে অক্টোবর, ১৯৭১।
প্রাথমিক বাছাই৪৮০ জন মুক্তিযোদ্ধা।
চূড়ান্ত যোদ্ধা১৩৫ জন (তাজউদ্দীন আহমদের আহবানে সাড়া দেওয়া)।
প্রশিক্ষকবৃন্দলে. কমান্ডার জি এম মার্টিস, লে. এ কে দাস ও লে. কপিল।
সাবমেরিনার সদস্যফ্রান্স থেকে পালিয়ে আসা ৮ জন বাঙালি নৌ-সদস্য।
মূল কার্যক্রমজাহাজ ধ্বংস, বন্দর অচল করা এবং লিম্পেট মাইন স্থাপন।
মৃত্যুর পরোয়ানা ও অদম্য সাহস

১৯৭১ সালের ১১ জুন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ যখন এই ক্যাম্প পরিদর্শনে যান, তখন তিনি কমান্ডোদের সামনে যুদ্ধের নিষ্ঠুর বাস্তবতা তুলে ধরেন। তিনি বলেছিলেন, এটি একটি ‘সুইসাইড স্কোয়াড’ বা আত্মঘাতী দল, যেখানে মৃত্যুর সম্ভাবনা শতভাগ। তাঁর এই বক্তব্যের পর ৪৮০ জনের মধ্যে ৩৪৫ জন সরে দাঁড়ালেও বাকি ১৩৫ জন অকুতোভয় তরুণ দেশমাতৃকার জন্য জীবন উৎসর্গ করতে রাজি হন। এই যোদ্ধাদের কাছ থেকে বন্ড পেপারে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল যে, যুদ্ধে প্রাণহানি হলে কেউ দায়ী থাকবে না।

পেশাদার সাবমেরিনারদের অন্তর্ভুক্তি

ফ্রান্স থেকে নিজেদের জীবন বাজি রেখে পালিয়ে আসা আটজন বাঙালি সাবমেরিনার এই বাহিনীর মূল শক্তি হিসেবে কাজ করেন। আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে আবদুর রাকিব মিয়া, সৈয়দ মোশারফ হোসেনসহ আটজন দক্ষ নাবিক পাকিস্তান নৌবাহিনীর চাকরি ছেড়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। তাঁদের পেশাদারিত্ব এবং রণকৌশল সাধারণ তরুণদের দুর্ধর্ষ কমান্ডোতে রূপান্তর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

প্রশিক্ষণের কঠোর শিডিউল

নৌ-কমান্ডোদের জীবন ছিল যান্ত্রিক ও অত্যন্ত কঠিন। প্রতিদিন ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করতে হতো। ভোর থেকে শুরু হয়ে মাঝরাত পর্যন্ত চলত শারীরিক কসরত, জুডো এবং দীর্ঘ সময় নিঃশব্দে সাঁতার কাটার অনুশীলন। বর্ষার উত্তাল ভাগীরথী নদীতে মাইন নিয়ে মাইলের পর মাইল সাঁতার কাটা ছিল তাঁদের প্রাত্যহিক রুটিন। অনেক সময় তীব্র স্রোতে কেউ ক্লান্ত হয়ে ডুবে গেলে রেসকিউ টিম তাদের উদ্ধার করত।

এই প্রশিক্ষণের ফসল ছিল ১৫ আগস্টের সেই বিশ্বখ্যাত নৌ-আক্রমণ, যা সারা বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল। ভাগীরথীর সেই উত্তাল তরঙ্গে জন্ম নেওয়া এই যোদ্ধারাই নিশ্চিত করেছিলেন যে, পাকিস্তানি বাহিনী জলপথে আর নিরাপদ নয়।