রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলমান প্রশাসনিক অচলাবস্থার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ছয়টি অনুষদের ডিনকে অপসারণ করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের টানা আন্দোলন, কর্মসূচি ও চাপের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়। সোমবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব আনুষ্ঠানিকভাবে ছয় ডিনের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি অনুমোদন করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, অপসারিত ছয় ডিন তাঁদের রুটিন প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে অপারগতা প্রকাশ করে লিখিত আবেদন জমা দেন। সেই আবেদন গ্রহণের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান বিধি অনুযায়ী ডিনদের দায়িত্ব আপাতত উপাচার্য ও তাঁর প্রতিনিধিদের হাতে ন্যস্ত করা হয়। ফলে অনুষদগুলোর একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম সচল রাখতে উপাচার্য নিজে এবং দুই উপ-উপাচার্য দায়িত্ব ভাগ করে নিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবনে সোমবার দুপুরে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ইফতিখারুল ইসলাম মাসউদ গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে সম্মানিত ছয়জন ডিন তাঁদের দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না বলে লিখিতভাবে অপারগতা প্রকাশ করেছেন। উপাচার্য সেটি গ্রহণ করার পর বিধি অনুযায়ী ডিনের দায়িত্ব তাঁর ওপর বর্তায়। এরপর সিদ্ধান্ত হয়, উপাচার্য ও দুই উপ-উপাচার্য মিলে সাময়িকভাবে এই দায়িত্ব পালন করবেন।”
তিনি আরও জানান, দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে বিজ্ঞান ও প্রকৌশল অনুষদের সার্বিক তত্ত্বাবধান সরাসরি উপাচার্য করবেন। ব্যবসায় শিক্ষা ও আইন অনুষদের দায়িত্ব উপাচার্যের প্রতিনিধি হিসেবে অধ্যাপক মোহাম্মদ মাঈন উদ্দীন পালন করবেন। সামাজিক বিজ্ঞান ও ভূবিজ্ঞান অনুষদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিনকে।
অপসারিত ছয় ডিনের তালিকা নিচের টেবিলে তুলে ধরা হলো—
| অনুষদ | ডিনের নাম |
|---|---|
| আইন অনুষদ | অধ্যাপক আবু নাসের মো. ওয়াহিদ |
| ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ | অধ্যাপক এ এস এম কামরুজ্জামান |
| সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ | অধ্যাপক এস এম এক্রাম উল্ল্যাহ |
| ভূবিজ্ঞান অনুষদ | অধ্যাপক এ এইচ এম সেলিম রেজা |
| প্রকৌশল অনুষদ | অধ্যাপক বিমল কুমার প্রামাণিক |
| বিজ্ঞান অনুষদ | অধ্যাপক নাসিমা আখতার |
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত এই ডিনদের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হয় গত ১৭ ডিসেম্বর। তবে প্রশাসন মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয় এবং সেখান থেকেই আন্দোলনের সূত্রপাত।
গত রোববার দুপুরে ছয় ডিনের পদত্যাগ দাবিতে একদল শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, প্রক্টর, রেজিস্ট্রারসহ প্রশাসন ভবনের সব দপ্তরে তালা ঝুলিয়ে দেন। এতে পুরো প্রশাসনিক কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়ে। পরে বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আলোচনা হয়। সেখানে ডিনদের অপসারণের বিষয়ে আশ্বাস দেওয়া হলে বিকেল সাড়ে চারটার দিকে তালা খুলে দেওয়া হয়।
এরপর সন্ধ্যায় জরুরি বৈঠকে বসেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট ডিনরা। ওই বৈঠকেই ছয় ডিন পৃথকভাবে দায়িত্ব পালনে অপারগতার আবেদন জমা দেন।
এর আগে একই দিন সকালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন আম্মার ছয় ডিনের পদত্যাগ দাবিতে কর্মসূচি পালন করেন। তিনি রাকসু ভবনের সামনে অবস্থান নেন এবং গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে একে একে ডিনদের ফোন করেন। পরে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ ডিনস কমপ্লেক্সের কয়েকটি কার্যালয়েও তালা ঝুলিয়ে দেয়।
সামগ্রিকভাবে, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ডিনদের অপসারণ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, নতুন ব্যবস্থাপনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশ কতটা স্থিতিশীল ও কার্যকর হয়।
