বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনে অবিস্মরণীয় অবদান রাখা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান বীর সেনানী এ কে খন্দকার বীর উত্তম আর নেই। বিজয়ের মাসেই এই সাহসী যোদ্ধার চলে যাওয়া দেশবাসীকে গভীর শোকের সাগরে ডুবিয়েছে।
আজ শনিবার সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটে বার্ধক্যের কারণে তিনি ইন্তেকাল করেন, জানিয়েছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৫ বছর। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
মুক্তিবাহিনীর উপপ্রধান (ডেপুটি চিফ অব স্টাফ) হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করা এ কে খন্দকার পরবর্তীতে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রথম প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এয়ার ভাইস মার্শাল খন্দকার পরে রাজনীতিতেও সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করে দুই দফায় মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে বলেন, “এ কে খন্দকার ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অবিস্মরণীয় সৈনিক। তিনি ছিলেন দৃঢ়চেতা মুক্তিযোদ্ধা, সৎ, সাহসী এবং আদর্শনিষ্ঠ দেশপ্রেমিক। তাঁর জীবন, কর্ম এবং আদর্শ নতুন প্রজন্মের জন্য চিরন্তন অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।”
এ কে খন্দকারের জন্ম ১৯৩০ সালে রংপুরে, তাঁর পিতার কর্মস্থলে হলেও আদি নিবাস ছিল পাবনা জেলার বেড়া উপজেলার পুরান ভারেঙ্গা গ্রামে। ১৯৪৭ সালে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯৪৯ সালে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। ১৯৫২ সালে পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। গ্রুপ ক্যাপ্টেন হিসেবে তিনি বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন এবং মুক্তিবাহিনীতে ডেপুটি চিফ অব স্টাফ হিসেবে নিযুক্ত হন।
মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে তিনি পাকিস্তান বিমানবাহিনীর দ্বিতীয় প্রধান ছিলেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে তিনি দেশের মুক্তির লড়াইয়ে অংশ নেন। ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক মুহূর্তে মুক্তিবাহিনীর প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। স্বাধীনতার পর বিমানবাহিনীর প্রথম প্রধান হিসেবে তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত বাহিনী পুনর্গঠন করেন এবং ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত দায়িত্বে থাকেন।
মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ১৯৭৩ সালে ‘বীর উত্তম’ খেতাব এবং ২০১১ সালে স্বাধীনতা পদক লাভ করেন। সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের সভাপতির দায়িত্বও তিনি পালন করেছেন।
রাজনীতিতেও সক্রিয় এই বীর সেনানী, এইচ এম এরশাদের সরকারে প্রথম মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে পুনরায় মন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন।
তিনি লিখেছেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসভিত্তিক আলোচিত গ্রন্থ ‘১৯৭১: ভেতরে বাইরে’, যা মুক্তিযুদ্ধের প্রাসঙ্গিক ও গভীর বোধ তুলে ধরে।
এ কে খন্দকার বীর উত্তমের মৃত্যু বাংলাদেশে এক দুঃখের খবর, যিনি ইতিহাসে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।