ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক প্রাঙ্গণে শাহবাগ থেকে টিএসসির দিকে অগ্রসর হলে চারুকলা অনুষদের পর ডান পাশে চোখে পড়ে নান্দনিক স্থাপত্যে গড়া কেন্দ্রীয় মসজিদ। ‘মসজিদুল জামিয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ নামে পরিচিত এই মসজিদের ডানদিকে অবস্থিত ঢাবি কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, আর বাম পাশে শায়িত আছেন বাংলার বিদ্রোহী কবি, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। এই প্রাঙ্গণ কেবল একটি শিক্ষাঙ্গন নয়; এটি বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের এক জীবন্ত স্মারক।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ২৪ মে ভারত সরকারের অনুমতি নিয়ে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে সপরিবারে বাংলাদেশে আনা হয়। ১৯৭৬ সালে তাকে স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়। সে বছরই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং জীবনের শেষ দিনগুলো তিনি ঢাকার পিজি হাসপাতালে কাটান। ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর আগে তিনি লিখে গিয়েছিলেন সেই অমর পঙ্ক্তি— ‘মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই’। রাষ্ট্রীয় শোকের মধ্য দিয়ে তার ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশেই সমাহিত করা হয়।
বিদ্রোহী কবির মৃত্যুর পর প্রায় পাঁচ দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু জ্ঞানী-গুণী, মনীষী ও খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব প্রয়াত হলেও নজরুলের সমাধির পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন হাতে গোনা কয়েকজন মাত্র। তাদের মধ্যে রয়েছেন জাতীয় অধ্যাপক ও শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, উপাচার্য ও ডাকসুর প্রথম সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী, বিশিষ্ট পদার্থবিজ্ঞানী ও উপাচার্য আব্দুল মতিন চৌধুরী, চিত্রশিল্পী ও জাতীয় পতাকার প্রণেতা কামরুল হাসান এবং সর্বশেষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ এম ওসমান গণি।
এতদিন পর সেই মর্যাদাপূর্ণ সারিতে যুক্ত হতে যাচ্ছে এক নতুন নাম— ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও জুলাই যোদ্ধা শহীদ শরিফ ওসমান হাদি। তার পরিবার, বর্তমানে ইসলামি ছাত্র শিবিরের নিয়ন্ত্রণাধীন ডাকসু এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের যৌথ সিদ্ধান্তে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশেই তাকে সমাহিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একজন তরুণ রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই হাদি টিভি টকশো ও ইউটিউবভিত্তিক আলোচনায় তার স্পষ্টভাষী, আপসহীন অবস্থানের কারণে দেশজুড়ে পরিচিত হয়ে ওঠেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে একজন তরুণ অ্যাক্টিভিস্টের এমন সম্মান লাভ এক বিরল ঘটনা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
গত ১২ ডিসেম্বর ঢাকার পুরানা পল্টনে প্রকাশ্য দিবালোকে আততায়ীর গুলিতে মারাত্মকভাবে আহত হওয়ার পর হাদিকে প্রথমে ঢাকায় এবং পরে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকাকালে তার সুস্থতার জন্য সারাদেশের মানুষ দোয়া করেছে— সাম্প্রতিক সময়ে যা খুব কম ব্যক্তির ক্ষেত্রেই দেখা গেছে।
জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী অস্থির সময়ে, যখন বিভাজন, ভয় ও অনিশ্চয়তা সমাজকে গ্রাস করছিল, তখন হাদি হয়ে উঠেছিলেন প্রতিবাদের এক নির্ভীক প্রতীক। মঞ্চে বা মাইক্রোফোনের সামনে তার কণ্ঠে ছিল না দ্বিধা, চোখে ছিল না ভয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, সত্য উচ্চারণের ঝুঁকি থাকলেও নীরব থাকার দায় আরও ভয়ংকর। যদিও তার ভাষা ও শ্লোগান নিয়ে বিতর্ক ছিল, সমালোচনাও কম হয়নি, তবু তিনি নিজ বিশ্বাস থেকে কখনো সরে যাননি।
শোষণ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে অবিচল থেকে তিনি লালন করেছিলেন ন্যায়ভিত্তিক এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন। আজ তার বিদায়ের মধ্য দিয়ে সেই স্বপ্ন আরও বড় দায়িত্ব হয়ে সামনে এসেছে। বিভাজন ভুলে ন্যায়, ইনসাফ ও মানবিকতার পক্ষে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসাই হবে তার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা। ওপারে ভালো থাকুন হাদি।
