একসময় যে মেয়েটিকে দেখে মা–বাবার মনে জমেছিল দুশ্চিন্তার পাহাড়, আজ সেই মেয়েই দেশের জন্য বয়ে আনছে গৌরব। শারীরিক গড়নের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছে কিশোরী অ্যাথলেট চৈতী রানী দেব। এশিয়ান ইয়ুথ প্যারা গেমসে অংশ নিয়ে ইতিহাস গড়েছে সে—বাংলাদেশের জন্য প্রথমবারের মতো প্যারা স্পোর্টসে স্বর্ণপদক এনে।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভূনবীর গ্রামের বাসিন্দা চৈতী রানী দেবের বয়স মাত্র ১৩ বছর। উচ্চতা মাত্র ৩ ফুট ৭ ইঞ্চি। ছোটবেলায় অন্য শিশুদের মতো তার শারীরিক বৃদ্ধি না হওয়ায় পরিবার বুঝতে পারে, চৈতী খর্বাকৃতির (ডোয়ার্ফিজমে আক্রান্ত)। তখন মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে যান মা–বাবা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই দুশ্চিন্তাই বদলে যায় প্রত্যয়ে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত এশিয়ান ইয়ুথ প্যারা গেমস ২০২৫-এ চৈতী বর্শা নিক্ষেপ ও ১০০ মিটার দৌড়—এই দুই ইভেন্টেই স্বর্ণপদক জিতে নেয়। ৭ ডিসেম্বর শুরু হওয়া এই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা চলবে ১৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত। বাংলাদেশের প্যারা স্পোর্টস ইতিহাসে এটি এক অনন্য অর্জন।
ভূনবীর দশরথ হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী চৈতী একসময় গ্রামবাসীর কাছে পরিচিত ছিল শুধু তার খর্বাকৃতির জন্য। খেলাধুলায় তার প্রতিভা ছিল অনেকটাই আড়ালে। তবে এখন সেই দৃশ্য বদলে গেছে। গ্রামবাসী, শিক্ষক ও সহপাঠীদের কাছে সে অনুপ্রেরণার নাম। স্কুলে সে এখন এক ‘তারকা’।
চৈতীর বাবা সত্য দেব কৃষিকাজের পাশাপাশি ডেকোরেশনের সামগ্রী ভাড়া দেন। মা শিলু রানী দেব গৃহিণী। চার বোনের মধ্যে চৈতী সবার ছোট। সীমিত সামর্থ্যের পরিবার হলেও মেয়ের স্বপ্ন পূরণে কখনো পিছপা হননি তাঁরা।
দুবাই যাওয়ার আগে প্রায় এক মাস সাভারের বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি)-এ নিবিড় প্রশিক্ষণ নেয় চৈতী। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই অ্যাথলেটিকসে তার যাত্রা শুরু। গত অক্টোবরে জাতীয় প্যারালিম্পিক কমিটির আয়োজিত ন্যাশনাল ইয়ুথ প্যারা গেমস-এ ১০০ মিটার দৌড়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে সে নিজের সক্ষমতার প্রমাণ দেয়।
চৈতীর প্রতিভা প্রথম নজরে আনেন স্পোর্টস ফর হোপ অ্যান্ড ইনডিপেনডেন্স (শি) নামের একটি সংগঠনের সদস্যরা। বিনা মূল্যে খেলাধুলার প্রশিক্ষণ দেওয়া এই সংগঠনের কোচ ও ক্রীড়া উন্নয়ন কর্মকর্তাদের হাত ধরেই চৈতীর সম্ভাবনা বিকশিত হয়। সীমাবদ্ধ সরঞ্জামের মধ্যেও বিকেএসপির কোচেরা তার জন্য বিশেষভাবে বর্শা প্রস্তুত করে অনুশীলন করান।
চৈতীর মা শিলু রানী দেব বলেন, “একসময় মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব ভয় পেতাম। আজ সে দেশের জন্য পদক এনে দিয়েছে—এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় আনন্দ।” চৈতীর স্বপ্ন এখানেই থেমে নেই। খেলাধুলা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সে পড়াশোনা শেষ করে একজন চিকিৎসক হতে চায়।
চৈতীর গল্প প্রমাণ করে—উচ্চতা নয়, সাহস আর স্বপ্নই মানুষকে বড় করে।
চৈতী রানী দেব: এক নজরে
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| নাম | চৈতী রানী দেব |
| বয়স | ১৩ বছর |
| উচ্চতা | ৩ ফুট ৭ ইঞ্চি |
| বাড়ি | ভূনবীর গ্রাম, শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার |
| প্রতিযোগিতা | এশিয়ান ইয়ুথ প্যারা গেমস ২০২৫ |
| অর্জন | বর্শা নিক্ষেপ ও ১০০ মিটার দৌড়ে ২টি স্বর্ণপদক |
| প্রশিক্ষণ | বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি) |
| স্বপ্ন | ক্রীড়াবিদ হিসেবে এগোনো ও চিকিৎসক হওয়া |
চৈতীর এই সাফল্য শুধু একটি পদক জয়ের গল্প নয়; এটি হাজারো সীমাবদ্ধতার মাঝেও সম্ভাবনার আলো জ্বালানোর অনুপ্রেরণামূলক উদাহরণ।