বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে এমন অনেক নাম আছে, যাদের ত্যাগ, সাহস ও নিবেদিত চেতনা আমাদের লাল-সবুজের পতাকায় চিরদিনের মতো অম্লান হয়ে আছে। সেই উজ্জ্বল নামগুলোর অন্যতম—শহীদ সাংবাদিক নিজাম উদ্দিন আহমদ।
১৯২৯ সালের মুন্সিগঞ্জ জেলার লৌহজং থানার মাওয়া গ্রামে জন্ম নেন নিজাম উদ্দিন। বাবা সিরাজুল ইসলাম ছিলেন জাহাজের অডিট অফিসার, মা ফাতেমা বেগম। এক কর্মনিষ্ঠ, সততা ও মানবিকতায় সমৃদ্ধ পরিবারের সন্তান হিসেবে তিনি বড় হন। পরবর্তীতে ১৯৮৮ সালে ঘটে যাওয়া শারমিন রীমা হত্যাকাণ্ডে শারমিন ছিলেন তাঁরই কন্যা, যা আজও জাতির বিবেককে কাঁপিয়ে রাখে।
শিক্ষাজীবন শুরু করেন বিক্রমপুর ভাগ্যকুল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হয়ে। পরে ভর্তি হন সরকারি হরগঙ্গা কলেজে। ছাত্রাবস্থাতেই তিনি প্রগতিশীল রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৬৫ সালে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের তথাকথিত “মৌলিক গণতন্ত্র” নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। এটি তাঁর গণমুখী নেতৃত্বের এক উজ্জ্বল প্রমাণ।
১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলন ও ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান—সবগুলো আন্দোলনে তিনি ছিলেন অকুতোভয়। এই সংগ্রামী মানসিকতা তাঁকে সাংবাদিকতার দিকে নিয়ে যায়।
১৯৫০ সালে করাচি থেকে প্রকাশিত Civil and Military Gazette-এ কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে কাজ করেন দৈনিক মিল্লাত, আজাদ, ঢাকা টাইমস, Pakistan Observer-এ। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা—এপিপি, ইউপিআই, পিপিআই, রয়টার্স, এএফপি ও বিবিসি—সবখানেই তাঁর প্রভাবিত পদচিহ্ন স্পষ্ট।
স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে নিজাম উদ্দিন প্রতিদিন বিদেশি সাংবাদিকদের কাছে পৌঁছে দিতেন দেশের গণহত্যা ও যুদ্ধের বিবরণ। তাঁর তথ্যভিত্তিক এই ‘সংবাদযুদ্ধ’ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে এই সাহসী দায়িত্ববোধই তাঁকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। ১৯৭১ সালের ১২ ডিসেম্বর, পুরান ঢাকার ১২ নম্বর রোকনপুর থেকে পাকিস্তানি হানাদার ও আলবদর বাহিনী তাঁকে তুলে নিয়ে যায়। সেই দিন ইতিহাসের পাতা থেকে নিভে যায় এক উজ্জ্বল প্রদীপ। আজও তাঁর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
তবুও শহীদ নিজাম উদ্দিন আহমদের ত্যাগ, সত্যনিষ্ঠা ও অবদান আমাদের জাতিসত্তাকে চিরজাগরুক রাখে। শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি এই অকুতোভয় শব্দযোদ্ধাকে—শহীদ সাংবাদিক নিজাম উদ্দিন আহমদ।