খেলাপি ঋণের চাপ বেড়ে ৯ নন-ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান বন্ধ

দুর্বল ব্যাংককে তারল্য সহায়তা দিয়ে স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হলেও খেলাপি ঋণের চাপের কারণে দেশের ৯টি নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) বন্ধের পথে। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ব্যাংকের মতোই অবসায়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানে জমা থাকা আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়া হবে। তবে কোনো তহবিল গঠন করে প্রতিষ্ঠানগুলোকে সচল রাখা যায় কি-না, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদরা পরামর্শ দিয়েছেন।

গাজীপুরের বাসিন্দা সৈকত দাসের উদাহরণ এই সমস্যার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে। তিনি প্রায় ৭ লাখ টাকা আভিবা ফাইন্যান্সে বিনিয়োগ করেছেন, যা তার টিউশন ফি, বাবার রেখে যাওয়া অর্থ এবং পরিবারের অন্যান্য সঞ্চয় থেকে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটি বন্ধের ঘোষণা দেয়ার পর টাকা তুলতে গেলে বারবার খালি হাতে ফিরে যেতে হচ্ছে। সৈকত জানিয়েছেন, যদি তার টাকা ফেরত না পাওয়া যায়, তাহলে তার কাছে আর কোনো বিকল্প থাকবে না।

এ ছাড়া আরও অনেক মানুষ বিপদের মুখে পড়েছেন, যারা খেলাপি ঋণ, জালিয়াতি ও দুর্নীতির কারণে বন্ধ হতে যাওয়া ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আমানত রেখেছেন। তাদের অভিযোগ, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের টাকা ঠিকই ফেরত দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু সাধারণ আমানতকারীদের টাকা ফেরত পাওয়া দুষ্কর হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে দেশের আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ৯টি প্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ব্যাংক বহির্ভূত খাতে ৩৫টি প্রতিষ্ঠানে মোট খেলাপি ঋণ ছিল ২৫ হাজার ৮৯ কোটি টাকা, যার ৫২ শতাংশই এই ৯টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কিত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, এসব প্রতিষ্ঠান এত দুর্বল যে ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা নেই। তাই এগুলো অবসায়নের আওতায় আনা হয়েছে। ধাপে ধাপে অবসায়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, অবসায়নে কর্মী ছাঁটাইয়ের প্রশ্নই নেই, কারণ প্রতিষ্ঠানই আর থাকবে না।

প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে খেলাপি ঋণের কী হবে এবং আমানতকারীদের টাকা কীভাবে ফেরত দেওয়া হবে, তা নিয়েও চিন্তাভাবনা চলছে। ব্যাংকগুলোকে তারল্য সহায়তা দিয়ে শক্তিশালী করার অভিজ্ঞতা থেকে অর্থনীতিবিদরা পরামর্শ দিয়েছেন, শর্তসাপেক্ষে এনবিএফআইগুলোকে পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।

বিআইবিএমের সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেছেন, প্রতিষ্ঠানগুলোকে শেষবারের মতো মূলধন সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হবে, যাতে দেখা যায় তারা ঘুরে দাঁড়াতে পারছে কি না। সুযোগের পরও যদি প্রতিষ্ঠান সক্ষম না হয়, তখন পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থায় থাকা ১৫টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ৪৯ হাজার ৬৪৩ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে খেলাপি রয়েছে ৩ হাজার ৬২৭ কোটি টাকা। গত বছর এসব প্রতিষ্ঠান মুনাফা করেছে ১ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা।

এই পরিস্থিতি দেশের নন-ব্যাংকিং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা এবং দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা পুনরায় তুলে এনেছে।