বগুড়া সদরের একটি হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় সরকারি বয়স্ক ভাতা ও বিধবা ভাতা পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ আদায় এবং আসন্ন নির্বাচনে নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট দেওয়ার অঙ্গীকার নেওয়ার অভিযোগে একজন ব্যক্তিকে আটক করেছে পুলিশ। ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও বক্তব্যের কারণে বিষয়টি নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।
আটক ব্যক্তির নাম মো. মোকসেদ আলী। তাঁর বাড়ি বগুড়া সদর উপজেলার ফাঁপোর ইউনিয়নের ইসলামপুর হরিগাড়ী উত্তর পাড়ায়। শনিবার (৬ ডিসেম্বর) দুপুরে স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরে খবর পেয়ে বগুড়া সদর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাঁকে হেফাজতে নেয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কয়েক দিন আগে মোকসেদ আলী নিজেকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দিয়ে ওই হিন্দু পল্লীতে যান। তিনি বয়স্ক ভাতা ও বিধবা ভাতা করে দেওয়ার আশ্বাস দেন এবং বলেন, দ্রুত কার্ড করে দিলে নিয়মিত সরকারি অর্থ পাওয়া যাবে। এই আশ্বাসে এলাকার বয়স্ক নারী ও বিধবা নারীরা তাঁর কাছে ছবি, জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি এবং ব্যক্তিগত তথ্য দেন। অভিযোগ রয়েছে, এই প্রক্রিয়ার জন্য তিনি প্রত্যেকের কাছ থেকে ৫০০ টাকা করে আদায় করেন।
এলাকাবাসীর আরও অভিযোগ, শুধু অর্থ আদায়েই বিষয়টি সীমাবদ্ধ ছিল না। মোকসেদ আলী ওই পল্লীর ভোটারদের আসন্ন নির্বাচনে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রতীক—দাঁড়িপাল্লায়—ভোট দেওয়ার জন্য উৎসাহিত করেন এবং মৌখিকভাবে অঙ্গীকার নেওয়ার চেষ্টা করেন। এতে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয় বলে স্থানীয়রা জানান।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে যখন শনিবার দুপুরে মোকসেদ আলী তাঁর এক মুরুব্বিকে সঙ্গে নিয়ে আবার ওই এলাকায় যান। স্থানীয়রা তাঁকে চিনে ফেলে ঘিরে ধরেন এবং প্রশ্ন করতে শুরু করেন। উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে মোকসেদ কয়েকটি অনলাইন আবেদনপত্রের কপি ফেরত দেন বলে জানা গেছে। এ সময় আশপাশের লোকজন ঘটনাটি মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করেন, যা পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ঘটনার পর এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লেও পুলিশ দ্রুত হস্তক্ষেপ করায় বড় ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হয়। বগুড়া সদর থানার ওসির সঙ্গে যোগাযোগের একাধিক চেষ্টা করা হলেও তিনি সাংবাদিকদের ফোন রিসিভ করেননি। তবে পুলিশের মিডিয়া শাখা থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে মোকসেদ আলীকে আটক করা হয়েছে এবং প্রাথমিকভাবে তাঁকে ‘টাউট’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, একটি প্রভাবশালী মহল আটক ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে নেওয়া এবং পুরো ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আইনানুগ প্রক্রিয়া চলমান থাকবে।
এদিকে, রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করতে বগুড়া জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আ. মালেক গণমাধ্যমে দাবি করেছেন, মোকসেদ আলী তাঁদের দলের কোনো কর্মী নন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, “মোকসেদ নামে যে ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তিনি জামায়াতের সঙ্গে যুক্ত নন। কেউ ব্যক্তি স্বার্থে দলের নাম ব্যবহার করলে সেটির দায় দল নেবে না।”
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা শুধু প্রতারণার অভিযোগ নয়; এটি নির্বাচন-পূর্ব সময়ে ভোটার প্রভাবিত করার একটি গুরুতর অভিযোগ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় সরকারি ভাতা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য উদ্বেগজনক। তাঁরা মনে করেন, এ ধরনের ঘটনায় দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে আরও বড় আকারে অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
নিচে ঘটনাটির মূল তথ্য সংক্ষেপে টেবিল আকারে তুলে ধরা হলো—
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| ঘটনা স্থান | বগুড়া সদর উপজেলার একটি হিন্দু পল্লী |
| আটক ব্যক্তি | মো. মোকসেদ আলী |
| অভিযোগের ধরন | ভাতা কার্ডের নামে অর্থ আদায় ও ভোট প্রভাব |
| আদায়কৃত অর্থ | জনপ্রতি ৫০০ টাকা |
| টার্গেট গোষ্ঠী | বয়স্ক ও বিধবা নারী |
| রাজনৈতিক অভিযোগ | দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেওয়ার প্রলোভন |
| আইনশৃঙ্খলা বাহিনী | বগুড়া সদর থানা পুলিশ |
| বর্তমান অবস্থা | তদন্ত চলমান |
সার্বিকভাবে, এই ঘটনা প্রশাসন, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা আশা করছেন, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে এবং ভবিষ্যতে এমন প্রতারণামূলক ও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা কঠোরভাবে দমন করা হবে।
