সারা দেশে পেঁয়াজের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি অবশেষে সরকারকে নতুন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে। রাজধানী ঢাকায় মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে পেঁয়াজের দাম কেজিপ্রতি ২০–৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে ১৫০ টাকার ওপরে ওঠায় জনসাধারণের ক্রয়ক্ষমতা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমন পরিস্থিতিতে আজ শনিবার কৃষি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হলো, রোববার থেকেই সীমিত আকারে পেঁয়াজ আমদানি পুনরায় শুরু করা হবে।
বিজ্ঞপ্তি অনুসারে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৫০টি আমদানি অনুমতি (আইপি) ইস্যু করা হবে এবং প্রতিটি আইপির আওতায় ৩০ টন পর্যন্ত পেঁয়াজ আমদানি সম্ভব হবে। অর্থাৎ দৈনিক সর্বোচ্চ ১,৫০০ টন পেঁয়াজ আমদানির পথ খুলে যাচ্ছে। তবে এই অনুমতি পাওয়া যাবে শুধুমাত্র তাঁদেরই, যারা গত ১ আগস্ট থেকে আমদানির আবেদন করে রেখেছিলেন। নতুনভাবে কেউ আবেদন করতে পারবেন না। একই ব্যক্তি একবারের বেশি আবেদন করতে পারবেন না বলেও নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
সরকার বলছে, বাজারকে সহনীয় পর্যায়ে ফিরিয়ে আনতে আমদানির অনুমতি দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। কেননা নতুন দেশীয় পেঁয়াজ বাজারে প্রবেশে এখনো সময় রয়েছে। আবার আগাম জাতের পরিমাণও খুব সীমিত। এদিকে দীর্ঘদিন আমদানির অনুমতি বন্ধ থাকায় বাজারে সরবরাহ ঘাটতির প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা দেয়। ফলে দামে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, অনেক খুচরা ব্যবসায়ী পেঁয়াজের দাম বাড়ার কারণ হিসেবে নতুন পেঁয়াজ না আসা এবং আমদানির অনুমতি বন্ধ থাকাকেই দায়ী করছেন। কেউ কেউ আবার পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং মজুতদারদের ভূমিকা সম্পর্কেও প্রশ্ন তুলছেন। তাঁদের মতে, বাজার ঘাটতি থাকলেও কয়েকটি গোষ্ঠী সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত মুনাফা আদায়ের চেষ্টা করছে।
এদিকে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন গত নভেম্বরেই সতর্ক করেছিলেন, বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে সরকার বাধ্য হয়ে আমদানির অনুমতি দেবে। তবে দাম নিয়ন্ত্রণে এলে সেই অনুমতি আবার বন্ধ করে দেওয়া হবে। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারের নীতিমালা জনপ্রিয়তা নয়, বাজার স্থিতিশীলতার ওপরই নির্ভর করে।
বিশ্লেষকদের মতে, সীমিত আকারে আমদানির অনুমতি দেওয়া বাজারে দ্রুত স্বস্তি না আনলেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ “সিগন্যাল” হিসেবে কাজ করবে। এতে একদিকে বাজারের অযৌক্তিক দাম নিয়ন্ত্রণে আসবে, অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের অস্থিরতা সৃষ্টির প্রবণতাও কমে যাবে। তবে তাঁদের আশঙ্কা, দেশে পেঁয়াজ পৌঁছাতে প্রয়োজনীয় সময় লাগবে বলে আগামী কয়েক দিন দাম আরও কিছুটা অস্থিতিশীল থাকতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আরও অভিমত, দেশে পেঁয়াজ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সংরক্ষণ–ব্যবস্থা উন্নয়নের ওপর বেশি জোর দিতে হবে। কারণ বারবার আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা বাজারকে অস্থিতিশীল করে তোলে এবং ভোক্তা চাপে পড়ে।
পরিশেষে বলা যায়, সরকারের এই সিদ্ধান্ত বাজারে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে এটি সাময়িক সমাধান মাত্র। দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন–পরিকল্পনা, সংরক্ষণ এবং আমদানি–নীতিমালা সমন্বিতভাবে জোরদার না করলে পেঁয়াজ সংকট বারবার ফিরে আসবে।
