এক রাতে চারটি হামলা: বগুড়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন

বগুড়ায় একই রাতে চারজনকে ছুরিকাঘাত ও ধারালো অস্ত্রে কুপিয়ে আহত করার ঘটনায় শহরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সোমবার রাতেই পরপর তিনটি এলাকায় হামলা হওয়ায় সাধারণ নাগরিকসহ বিভিন্ন মহলে চরম উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। এসব হামলার ধরন, সময় ও লক্ষ্যবস্তু বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, এটি কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—বরং এলাকায় অপরাধীদের সাহস বেড়ে যাওয়ার ইঙ্গিত বহন করে।

রাত সাড়ে ১০টার দিকে সূত্রাপুরের আজাদ পাম্পের সামনে প্রথম হামলার ঘটনা ঘটে। বাবু হোসেন (৪৮) নামের এক ব্যক্তি ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হন। দুর্বৃত্তরা তাকে আঘাত করে রাস্তার পাশে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। রক্তাক্ত অবস্থায় অনেকক্ষণ তিনি সেখানে সাহায্যহীন পড়ে থাকলেও কেউ এগিয়ে আসেনি। পথচারী নিবার জানান, “লোকজন ভয় পেয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও কেউ উদ্ধার করতে সাহস পাচ্ছিল না। পরে আমরা গিয়ে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাই।” বাবু জানান, হামলার সময় তার মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। এটি যে নিছক ছিনতাই নয়, বরং সহিংস ছিনতাই—তা স্পষ্ট।

এর মাত্র আধাঘণ্টা পর রাত ১১টার দিকে সুলতানগঞ্জপাড়ার হাকির মোড়ে আরেক দফা ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আহত হন রায়হান আলী (৩৬)। স্থানীয়দের মতে, পূর্বশত্রুতার জেরে তাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। ঘটনাস্থলের লোকজন দ্রুত তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। এই ঘটনায় স্পষ্ট হয় যে, বগুড়ার বিভিন্ন এলাকায় ব্যক্তিগত বিরোধকে কেন্দ্র করে সহিংসতা বেড়েছে।

তৃতীয় ঘটনাটি ঘটে শাজাহানপুরের জোড়া তালপুকুর এলাকায়, যেখানে রাত ১০টার দিকে সাব্বির (২২) ও সিজান (২২) নামে দুই তরুণকে ধারালো অস্ত্রে কুপিয়ে আহত করা হয়। তাদের পরিবারের দাবি, পূর্বশত্রুতার জের ধরে পরিকল্পিতভাবে এ হামলা করা হয়েছে। হামলার ধরন দেখে মনে হচ্ছে, দুর্বৃত্তরা ভিকটিমদের গতিবিধি আগেই নজরে রেখেছিল এবং সুযোগ বুঝে আক্রমণ করে।

এই তিনটি ঘটনায় মিল রয়েছে—সবগুলো রাতের অন্ধকারে সংঘটিত, এবং চারটি হামলাই ছুরি বা ধারালো অস্ত্র দিয়ে করা হয়েছে। এমন ধারাবাহিকতা পুলিশের কাছে পরিকল্পিত অপরাধচক্রের ইঙ্গিত বহন করতে পারে। আইনশৃঙ্খলা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ছিনতাইকারী গোষ্ঠী, স্থানীয় কিশোর গ্যাং, এবং ব্যক্তিগত শত্রুতা—এসব মিলে বগুড়ায় অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে।

শজিমেক হাসপাতালের সূত্র জানায়, চারজনকেই রাতেই চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে এবং তাদের অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। তবে হামলার ধরন দেখে ধারণা করা হচ্ছে, হামলাকারীরা ভিকটিমদের ভয় দেখানো, শায়েস্তা করা বা সম্পদ ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে হিংস্র কায়দায় আক্রমণ চালিয়েছে।

এদিকে পুলিশ বলছে, প্রতিটি ঘটনার তদন্ত চলছে। আলাদা টিম গঠন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট এলাকায় সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ, সম্ভাব্য সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং তথ্য-উপাত্ত যাচাইয়ের কাজ চলছে। পুলিশ সূত্র জানায়, বিশেষ করে সূত্রাপুর এলাকাটি ছিনতাইয়ের হটস্পট হিসেবে পরিচিত, যেখানে অনেক সময় রাতের বেলায় পথচারীরা নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করেন।

এই ধারাবাহিক হামলার পর স্থানীয়রা বলছেন, এখন রাতের বেলা বাইরে বের হতে ভয় লাগছে। কেউ কেউ বলেছেন, “শহরে মনে হচ্ছে আর নিরাপত্তা নেই। এক রাতেই চারজন আহত হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক।”

ঘটনাগুলোর তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বগুড়ার মানুষ এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। অপরাধীরা ধরা না পড়া পর্যন্ত নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।