পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু

পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের এক অগ্রগণ্য পুরোধা, আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার পথিকৃৎ এবং স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। তিনি ছিলেন আদর্শবাদী রাজনীতিক, মানবতাবাদী চিন্তক ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির এক দীপ্তিমান ব্যক্তিত্ব। তাঁর নেতৃত্বে ভারত শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতাই অর্জন করেনি, বরং একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের দিকনির্দেশনাও পেয়েছে।

১৮৮৯ সালের ১৪ নভেম্বর উত্তর ভারতের এলাহাবাদ শহরে এক সম্ভ্রান্ত কাশ্মীরি ব্রাহ্মণ পরিবারে জওহরলাল নেহেরুর জন্ম। তাঁর পিতা মতিলাল নেহেরু ছিলেন উপমহাদেশের অন্যতম খ্যাতিমান ব্যারিস্টার ও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রভাবশালী নেতা। পরিবারিক পরিবেশেই রাজনীতি, আইন ও সমাজভাবনার সঙ্গে তাঁর প্রাথমিক পরিচয় ঘটে। শৈশব থেকেই নেহেরুর মধ্যে ছিল জ্ঞানার্জনের গভীর আগ্রহ এবং মানবসভ্যতার প্রতি এক বিস্তৃত কৌতূহল, যা পরবর্তী জীবনে তাঁকে বিশ্বদর্শনে উদ্বুদ্ধ করে।

প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের পর তিনি ইংল্যান্ডে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন এবং লন্ডনে ব্যারিস্টারি শিক্ষা সম্পন্ন করে দেশে ফিরে আসেন। কিন্তু আইন পেশায় নিজেকে সীমাবদ্ধ না রেখে তিনি দ্রুত ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে যুক্ত হন। মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে পরিচালিত অহিংস আন্দোলন নেহেরুর রাজনৈতিক জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। গান্ধীর সান্নিধ্যে তিনি কেবল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বেই পৌঁছাননি, বরং সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে ওঠেন।

নেহেরু বিশ্বাস করতেন, স্বাধীন ভারতের ভিত্তি দাঁড়াতে হবে চারটি মূল স্তম্ভের ওপর—গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক চিন্তা। তিনি ধর্মীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে একটি বহুত্ববাদী রাষ্ট্র গড়ার স্বপ্ন দেখতেন, যেখানে জাতি, ধর্ম ও ভাষাভেদে সবাই সমান অধিকার ভোগ করবে। তাঁর উদ্যোগে ভারতে পরিকল্পিত অর্থনীতির সূচনা হয়, গড়ে ওঠে পরিকল্পনা কমিশন, এবং ভারী শিল্প, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। আইআইটি, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পেছনে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নেহেরু ছিলেন এক সম্মানিত রাষ্ট্রনায়ক। উপনিবেশ-উত্তর বিশ্বে সদ্য স্বাধীন দেশগুলোর জন্য তিনি একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির ধারণা তুলে ধরেন। জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের অন্যতম প্রবর্তক হিসেবে তিনি বিশ্বরাজনীতিতে ভারতের স্বতন্ত্র অবস্থান সুদৃঢ় করেন। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ এবং বৈশ্বিক সহযোগিতা ছিল তাঁর কূটনৈতিক দর্শনের মূল কথা।

রাজনীতির পাশাপাশি নেহেরু ছিলেন একজন চিন্তাশীল লেখক। তাঁর রচিত The Discovery of India, Glimpses of World History এবং Letters from a Father to His Daughter—এই গ্রন্থগুলো ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানবসভ্যতার গভীর বিশ্লেষণে বিশ্বসাহিত্যে বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে। সহজ ভাষা, যুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণ এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর লেখাকে পাঠকের কাছে অনন্য করে তুলেছে।

নেহেরু পরিবারের প্রভাব ভারতীয় রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী। তাঁর কন্যা ইন্দিরা গান্ধী এবং দৌহিত্র রাজীব গান্ধী—উভয়েই ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর মাধ্যমে নেহেরুর রাজনৈতিক ও আদর্শিক উত্তরাধিকার প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান থাকে।

নিচের সারণিতে পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুর জীবন ও অবদানের প্রধান দিকগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—

বিষয়বিবরণ
জন্ম১৪ নভেম্বর ১৮৮৯, এলাহাবাদ
পিতামতিলাল নেহেরু
শিক্ষাকেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যারিস্টারি (লন্ডন)
পদস্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী
মূল আদর্শগণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র
সাহিত্যকর্মDiscovery of India, Glimpses of World History
মৃত্যু২৭ মে ১৯৬৪

২৭ মে ১৯৬৪ সালে পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুর জীবনাবসান ঘটে। তাঁর প্রয়াণে ভারত হারিয়েছিল আধুনিক রাষ্ট্রগঠনের এক অনন্য রূপকারকে, আর বিশ্ব হারিয়েছিল এক প্রজ্ঞাবান আন্তর্জাতিক নায়ককে। আজও তাঁর আদর্শ, চিন্তা ও স্বপ্ন ভারতীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রেরণাসূত্র হিসেবে উজ্জ্বল হয়ে আছে।