ওস্তাদ আলাউদ্দিন সরকার—নাম উচ্চারণ করলেই যেন উপমহাদেশের সঙ্গীতঐতিহ্যের এক ত্রিকালদর্শী পুরোধা ব্যক্তিত্বকে স্মরণ করা হয়। ইতিহাসের ধূসর পাতায় তিনি এক উজ্জ্বল কিংবদন্তি; সময়কে অতিক্রম করে দাঁড়িয়ে থাকা এক প্রজ্ঞাময় শিল্পী।
বৃটিশ শাসনের দ্বিপ্রহর, পাকিস্তানি অপশাসনের অন্ধকার, আর স্বাধীন বাংলাদেশের সবুজ শস্যশ্যামল সমৃদ্ধি—তিনটি যুগ স্বচক্ষে দেখেছেন তিনি। ১৯০১ সালে বগুড়া সদরের বৃন্দাবনপাড়ার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা আব্দুর রহমান সরকার ছিলেন বগুড়া রেজিস্ট্রি অফিসের মোহরার।
শৈশব থেকেই সঙ্গীত ছিল তাঁর জীবনের প্রথম ও প্রধান নেশা। স্কুলজীবনেই তিনি সঙ্গীত সাধনায় এতটাই ডুবে গিয়েছিলেন যে আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় এগোতে পারেননি, অথচ বই-পুস্তক পড়ার প্রতি ছিল বিরল অনুরাগ।
তাঁর সঙ্গীতশক্তি উপমহাদেশের শিল্পীদেরও বিস্মিত করেছিল। খ্যাতিমান নৃত্যশিল্পী বুলবুল চৌধুরী তাঁর গান শুনে উচ্চ প্রশংসা করেছিলেন। ওস্তাদ এনায়েত খানের সঙ্গে ছিল তাঁর গভীর বন্ধুত্ব।
একবার তাঁর তীক্ষ্ণ কৌতুকবোধ ও সুমধুর সঙ্গীত পরিবেশনায় মুগ্ধ হয়ে মেগাফোন কোম্পানির এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা তাঁকে এককালীন চারশো টাকা পুরস্কার দেন—যা তখনকার দিনে এক বিরল সম্মান।
প্রখ্যাত ভাওয়াইয়া শিল্পী আব্বাসউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে তিনি কলকাতায় দীর্ঘদিন একসঙ্গে ছিলেন। সেই সূত্রে পরিচয় হয় বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে। নজরুল তাঁর গান শুনে বিমুগ্ধ হয়েছিলেন। পরে নজরুল চলচ্চিত্রে যুক্ত হলে, ১৯৩৯ সালে তাঁর পরিচালিত সাপুড়েসহ বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন ওস্তাদ আলাউদ্দিন সরকার। আজ সেসব সবই ইতিহাসের ধূসর স্মৃতি।
মানুষকে তিনি ভালোবাসতেন অগাধভাবে; এর চেয়েও তিনি ছিলেন নিখাদ পশুপ্রেমী। ছাত্রজীবনে বহুবার তাঁকে দেখা গেছে—মেহেদি রাঙানো চুল-দাড়ি, সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরে প্রতিদিন বিকেলে বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী উডবার্ন পাবলিক লাইব্রেরিতে হেঁটে যেতেন, আবার হেঁটেই ফিরতেন। পথে কোনো ছাগল চোখে পড়লে গাছ থেকে কাঁঠাল পাতার ডাল ভেঙে খেতে দিয়ে আদর করতেন।
১৪ নভেম্বর ১৯৯১—এই দিনে বগুড়ার নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই কিংবদন্তি সঙ্গীতজ্ঞ। তাঁর প্রয়াণে হারিয়ে যায় এক জীবন্ত ইতিহাস, এক সুসময়, এক সুরলোক।
শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি
ওস্তাদ আলাউদ্দিন সরকারকে।
