খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৯ই নভেম্বর ২০২৫, ৬:২৫ পিএম

রাজশাহীর বাঘা উপজেলায় মোবাইল ফোনে গেম খেলাকে কেন্দ্র করে পারিবারিক অভিমানের জেরে কারিমা খাতুন (১৮) নামে এক কলেজছাত্রীর আত্মহত্যার মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। শনিবার (৮ নভেম্বর) সন্ধ্যায় উপজেলার আড়ানী পৌরসভার নুরনগর গ্রামে এই ঘটনাটি ঘটে। মাত্র ১৮ বছর বয়সী এক তরুণীর এমন অকাল মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে মোবাইল আসক্তির ভয়াবহতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
Table of Contents
নিহত কারিমা খাতুন নুরনগর গ্রামের বাসিন্দা কামরুল ইসলামের কন্যা। তিনি স্থানীয় এরশাদ আলী মহিলা ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণীর (প্রথম বর্ষ) শিক্ষার্থী ছিলেন। পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কারিমা দীর্ঘক্ষণ ধরে মোবাইল ফোনে গেম খেলায় মগ্ন ছিলেন। পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটা বা অতিরিক্ত আসক্তির আশঙ্কায় পরিবারের সদস্যরা তাকে গেম খেলতে নিষেধ করেন এবং একপর্যায়ে তার হাত থেকে মোবাইল ফোনটি কেড়ে নেওয়া হয়।
এই সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে কারিমা প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ ও অভিমানী হয়ে পড়েন। সন্ধ্যার দিকে পরিবারের সবার অগোচরে তিনি নিজের শোবার ঘরে যান এবং ঘরের তীরের (আড়া) সাথে ওড়না পেঁচিয়ে গলায় ফাঁস দেন। বেশ কিছুক্ষণ তার কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে পরিবারের লোকজন ডাকাডাকি শুরু করেন। কোনো সাড়া না পেয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে তাকে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
রক্তাক্ত বা সংজ্ঞাহীন অবস্থায় কারিমাকে দ্রুত স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করেন। তবে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তার মৃত্যু হয়েছে বলে চিকিৎসক নিশ্চিত করেন। এরপর বিষয়টি থানায় অবহিত করা হলে পুলিশ হাসপাতাল থেকে মরদেহটি নিজেদের হেফাজতে নেয়।
ঘটনার প্রধান দিকগুলো নিচে একটি সারণির মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| বিষয় | বিবরণ |
| নিহতের নাম | কারিমা খাতুন |
| বয়স ও পেশা | ১৮ বছর; কলেজছাত্রী (১ম বর্ষ) |
| পিতার নাম | কামরুল ইসলাম |
| শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান | এরশাদ আলী মহিলা ডিগ্রি কলেজ |
| ঘটনার স্থান | নুরনগর গ্রাম, আড়ানী পৌরসভা, বাঘা, রাজশাহী |
| ঘটনার তারিখ ও সময় | শনিবার (৮ নভেম্বর), সন্ধ্যা সময় |
| মৃত্যুর কারণ (প্রাথমিক) | গেম খেলায় বাধা দেওয়ায় অভিমান করে আত্মহত্যা |
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বাঘা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু ফয়সাল মোহাম্মদ আছাদুজ্জামান (আফম আছাদুজ্জামান) জানান, খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। প্রাথমিকভাবে এটি একটি আত্মহত্যার ঘটনা বলে প্রতীয়মান হয়েছে। পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করেছে।
ওসি আরও জানান, এই ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যুর (ইউডি) মামলা দায়ের করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যাবে। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে মোবাইল কেড়ে নেওয়ার বিষয়টিই মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বর্তমান সময়ে কিশোর-কিশোরী ও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মোবাইল গেমিং এবং সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতি আসক্তি একটি বৈশ্বিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনে সময় কাটানোর ফলে তরুণদের মধ্যে মেজাজ খিটখিটে হওয়া, ধৈর্য কমে যাওয়া এবং তুচ্ছ কারণে চরম আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠার প্রবণতা বাড়ছে। কারিমা খাতুনের এই ঘটনাটি তারই একটি প্রতিফলন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সন্তানদের থেকে হঠাৎ করে মোবাইল কেড়ে না নিয়ে তাদের সাথে বন্ধুসুলভ আলোচনা করা এবং ডিজিটাল ডিভাইসের বাইরে খেলাধুলা বা সৃজনশীল কাজে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। একটি তুচ্ছ খেলনা বা ডিভাইসের জন্য নিজের মহামূল্যবান জীবন বিসর্জন দেওয়ার মতো ঘটনাগুলো রোধ করতে পারিবারিক সচেতনতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
বাঘার এই ঘটনাটি কেবল একটি পরিবারের শোক নয়, বরং এটি পুরো সমাজের জন্য একটি সতর্কবার্তা। শিক্ষা জীবনে প্রবেশের মুখেই একজন মেধাবী ছাত্রীর এমন বিদায় অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
কোনো সম্পর্কিত খবর পাওয়া যায়নি.
মন্তব্য