দেশে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রাখতে এবং সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় আজ রোববার (৮ মার্চ) থেকে নতুন পদ্ধতিতে জ্বালানি তেল বিক্রি কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সরকার নির্ধারিত রেশনিং ব্যবস্থার আওতায় যানবাহনের ধরন অনুযায়ী তেল সরবরাহের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে।
জ্বালানি বিভাগ ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন যৌথভাবে এই নতুন নীতিমালা বাস্তবায়ন করছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত সম্প্রতি দেশের সব জ্বালানি বিক্রয়কেন্দ্রকে এই নির্দেশনা অনুসরণের জন্য প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে শৃঙ্খলা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। তবুও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় সাময়িক চাপ সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে চলমান সংঘাতের ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ও সরবরাহ উভয় ক্ষেত্রেই অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে অপ্রয়োজনীয় মজুত, অতিরিক্ত ব্যবহার এবং কৃত্রিম সংকট ঠেকাতে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের জন্য প্রতিদিন সর্বোচ্চ কত লিটার জ্বালানি তেল নেওয়া যাবে তা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এতে ব্যক্তিগত যানবাহন থেকে শুরু করে গণপরিবহন এবং পণ্যবাহী যানবাহন পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট সীমা অনুসরণ করতে হবে।
নিচের সারণিতে যানভেদে নির্ধারিত জ্বালানি তেলের দৈনিক সর্বোচ্চ সীমা তুলে ধরা হলো—
| যানবাহনের ধরন | দৈনিক সর্বোচ্চ জ্বালানি (লিটার) | জ্বালানির ধরন |
|---|---|---|
| মোটরসাইকেল | ২ | পেট্রল বা অকটেন |
| ব্যক্তিগত মোটরগাড়ি | ১০ | পেট্রল বা অকটেন |
| বড় ব্যক্তিগত গাড়ি ও জিপ ধরনের যান | ২০ | পেট্রল বা অকটেন |
| মাইক্রোবাস | ২৫ | পেট্রল বা অকটেন |
| স্থানীয় রুটের যাত্রীবাহী বাস | ৭০–৮০ | ডিজেল |
| ছোট পণ্যবাহী যান | ৭০–৮০ | ডিজেল |
| দূরপাল্লার যাত্রীবাহী বাস | ২০০–২২০ | ডিজেল |
| বড় পণ্যবাহী ট্রাক | ২০০–২২০ | ডিজেল |
| পণ্যবাহী ধারক পরিবহনকারী ট্রাক | ২০০–২২০ | ডিজেল |
সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই সীমা মেনে চললে দেশের জ্বালানি সরবরাহ দীর্ঘ সময় ধরে স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে জরুরি খাত যেমন গণপরিবহন, পণ্য পরিবহন ও কৃষিখাতে জ্বালানির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা যাবে।
নতুন ব্যবস্থার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে আজ থেকেই সারাদেশে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জ্বালানি মন্ত্রী জানিয়েছেন, কোনো পাম্প যদি নির্ধারিত সীমার বেশি তেল বিক্রি করে বা কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে জরিমানা, লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিলের মতো শাস্তিও দেওয়া হতে পারে।
মন্ত্রী আরও জানান, আগামী ৯ মার্চ দেশের সমুদ্রবন্দরে আরও দুটি তেলবাহী জাহাজ পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এসব জাহাজ থেকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল খালাস করা হলে জাতীয় মজুত আরও শক্তিশালী হবে।
গত কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন জ্বালানি বিক্রয়কেন্দ্রে তেল সংগ্রহের জন্য দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। অনেক সাধারণ মানুষ সম্ভাব্য সংকটের আশঙ্কায় প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল নেওয়ার চেষ্টা করছেন। এতে সাময়িক চাপ সৃষ্টি হলেও সরকার বারবার আশ্বস্ত করছে যে দেশে জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন রেশনিং ব্যবস্থা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে তেল সরবরাহে শৃঙ্খলা বজায় থাকবে এবং অপ্রয়োজনীয় অপচয় কমে আসবে। একই সঙ্গে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি বা অতিরিক্ত মজুত করার প্রবণতাও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।
