৩০ আসনে ভোট কারচুপির অভিযোগে ইসিতে ১১ দলীয় জোট

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রেশ কাটতে না কাটতেই ভোটের মাঠের বিতর্ক এখন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) দোরগোড়ায়। নির্বাচনে ৩০টি সংসদীয় আসনে ব্যাপক ভোট জালিয়াতি, কারচুপি এবং নজিরবিহীন অনিয়মের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানাতে আজ নির্বাচন কমিশনে হাজির হয়েছে ১১ দলীয় জোটের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল।

অভিযোগের প্রেক্ষাপট ও ইসিতে অবস্থান

আজ রোববার বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত নির্বাচন কমিশন ভবনে প্রবেশ করেন জোটের প্রতিনিধিরা। তাদের মূল লক্ষ্য হলো বিতর্কিত ৩০টি আসনে ভোটের ফলাফল বাতিল করে পুনরায় ভোট গণনার জোরালো দাবি জানানো। জোটের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নির্বাচনের দিন থেকেই তারা বিভিন্ন কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা এবং ফলাফল পাল্টে দেওয়ার আলামত পাচ্ছিলেন। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে তারা গণমাধ্যমের সামনে অভিযোগের বিস্তারিত তুলে ধরবেন।

এর আগে শনিবার বিকেলে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের অভিযোগের রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, অনেক আসনে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সরবরাহ করা ফলাফলের কাগজে স্পষ্ট ‘ওভার রাইটিং’ বা ঘষামাজা লক্ষ্য করা গেছে, যা আইনত দণ্ডনীয় এবং নির্বাচনের স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

জোটের প্রধান অভিযোগসমূহ

জোটের পক্ষ থেকে উত্থাপিত প্রধান অভিযোগগুলো নিচে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

  • ফলাফলে কারচুপি: প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের স্বাক্ষরিত শিটের সঙ্গে চূড়ান্ত ফলাফলের অমিল।

  • অস্বাভাবিক গতি: কিছু আসনে ফল ঘোষণা করা হয়েছে ‘বিদ্যুৎ গতিতে’, যা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় অসম্ভব বলে দাবি করা হচ্ছে।

  • বিলম্বিত ঘোষণা: কৌশলগত কারণে অনেক আসনে গভীর রাত পর্যন্ত ফল আটকে রেখে পরে পরিবর্তন করার অভিযোগ।

  • নথিপত্রে ঘষামাজা: ফলাফলের নথিতে স্পষ্ট কাটাছেঁড়া ও কাটাকুটি।

  • আচরণবিধি লঙ্ঘন: ক্ষমতাসীন বা প্রভাবশালী প্রার্থীদের পক্ষ থেকে নির্বাচনী আচরণবিধির তোয়াক্কা না করা।

পুনঃগণনার দাবিকৃত আসনসমূহ

যে ৩০টি আসনে জোটের পক্ষ থেকে পুনঃগণনার আবেদন করা হয়েছে, তার একটি তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

বিভাগসংশ্লিষ্ট নির্বাচনী আসনসমূহ
ঢাকাঢাকা-৭, ঢাকা-৮, ঢাকা-১০, ঢাকা-১৩, ঢাকা-১৭, কিশোরগঞ্জ-৩, গোপালগঞ্জ-২
রংপুরপঞ্চগড়-১, ঠাকুরগাঁও-২, দিনাজপুর-৩, দিনাজপুর-৫, লালমনিরহাট-১, লালমনিরহাট-২, গাইবান্ধা-৪
রাজশাহীবগুড়া-৩, সিরাজগঞ্জ-১
খুলনাযশোর-৩, খুলনা-৩, খুলনা-৫
বরিশালবরগুনা-২, ঝালকাঠি-১, পিরোজপুর-২
ময়মনসিংহময়মনসিংহ-১, ময়মনসিংহ-৪, ময়মনসিংহ-১০
চট্টগ্রামব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫, চাঁদপুর-৪, চট্টগ্রাম-১৪, কক্সবাজার-৪

আইনি পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, অনিয়ম হওয়া মাত্রই সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তাদের মৌখিকভাবে জানানো হয়েছিল, কিন্তু তাতে কোনো কার্যকর ফল আসেনি। অ্যাডভোকেট জুবায়ের বলেন, “আমরা জনগণের ভোটের অধিকার রক্ষায় শেষ পর্যন্ত লড়াই করব। নির্বাচন কমিশন যদি আমাদের যৌক্তিক দাবিতে সাড়া না দেয়, তবে আমরা উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হওয়াসহ সম্ভাব্য সব ধরনের আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করব।”

প্রতিনিধিদলে জামায়াতের জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব মাওলানা আবদুল হালিম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট মুয়াযযম হোসেন হেলাল, ঢাকা-৬ আসনের প্রার্থী ড. আব্দুল মান্নান এবং পাবনা-১ আসন থেকে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেনসহ জোটের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত রয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের ওপরই বর্তমান নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করছে।