বাংলাদেশের নন-লাইফ (সাধারণ) বীমা খাতের দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সংকটের নাম ‘এজেন্ট কমিশন’। ১৯৩৮ সাল থেকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এই প্রথাটি বাংলাদেশে এসে রূপ নিয়েছিল এক অসম প্রতিযোগিতার হাতিয়ারে। এই প্রেক্ষাপটে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) সম্প্রতি এক সাহসী অথচ বিতর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে জারি করা ‘সার্কুলার নন-লাইফ: ১০৯/২০২৫’-এর মাধ্যমে ঘোষণা করা হয়েছে যে, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে নন-লাইফ বীমা খাতে আর কোনো ব্যক্তি এজেন্ট থাকবে না। এই সিদ্ধান্তের ফলে হাজারো এজেন্টের লাইসেন্স স্থগিত হবে এবং কমিশনের হার নেমে আসবে শূন্যতে।
নন-লাইফ বীমায় কমিশনের সর্বোচ্চ সীমা ১৫ শতাংশ নির্ধারিত থাকলেও এটি ছিল কেবল কাগজ-কলমে। বাস্তবে কোম্পানিগুলো ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন প্রদান করত, যা ছিল এক ‘ওপেন সিক্রেট’। এই অনিয়মের ফলে কোম্পানিগুলোর মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে, প্রিমিয়াম কমিয়ে দেখানোর প্রবণতা বেড়েছে এবং প্রকারান্তরে বীমা গ্রাহকের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা কার্যকর হয়নি। ২০২১ সালে আইডিআরএ একবার কঠোর অবস্থান নিয়ে কমিশন স্থগিত করলেও নীতিগত দোদুল্যমানতায় তা পুনরায় চালু হয়। অবশেষে ২০২৫ সালের শেষে এসে সংস্থাটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল।
এজেন্ট প্রথা বাতিলের ফলে কেবল কর্মসংস্থান নয়, সরকারি রাজস্বেও বড় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বর্তমানে কয়েক হাজার নিবন্ধিত এজেন্ট তাদের আয়ের ওপর কর প্রদান করেন। কমিশন ব্যবস্থা পুরোপুরি বন্ধ হলে এনবিআর বার্ষিক প্রায় ৩৩ কোটি টাকার সরাসরি কর রাজস্ব হারাতে পারে। এছাড়া এজেন্ট নিবন্ধন ও নবায়ন ফি বাবদ সরকারি আয়ও শূন্যের কোটায় নেমে আসবে। ৩,১৩৫ জন সক্রিয় নিবন্ধিত ব্যক্তি এজেন্টের জীবন-জীবিকা এখন হুমকির মুখে, যা বীমা খাতের জন্য একটি বড় সামাজিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
নিচে নন-লাইফ বীমা খাতের এজেন্ট ও রাজস্ব সংক্রান্ত একটি তুলনামূলক সারণি তুলে ধরা হলো:
এজেন্সি ব্যবস্থার আর্থিক ও কাঠামোগত প্রভাব
| সূচকের বিবরণ | সংশ্লিষ্ট তথ্য ও পরিসংখ্যান |
| সক্রিয় নিবন্ধিত ব্যক্তি এজেন্ট | ৩,১৩াস জন |
| লাইসেন্স নবায়ন ফি (প্রতি জন) | ১,২০০ টাকা |
| ২০২৩ সালে গ্রস প্রিমিয়াম আয় | ৪,৭৫২.৩৫ কোটি টাকা |
| আনুমানিক মোট কমিশন (১৪.২৫% হারে) | ৬৭৭ কোটি টাকা (প্রায়) |
| এনবিআর-এর সম্ভাব্য কর রাজস্ব ক্ষতি | ৩৩ কোটি টাকা (প্রায়) |
| নীতিগত পরিবর্তনের সময়কাল | ১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে কার্যকর |
নন-লাইফ বীমায় এজেন্টরাই মূলত প্রধান বিপণন চ্যানেল হিসেবে কাজ করেন। অনেক দক্ষ পেশাদার কোনো নির্দিষ্ট বেতন ছাড়াই কেবল কমিশনের ওপর ভিত্তি করে ব্যবসা সংগ্রহ করেন। হুট করে এই চ্যানেলটি বন্ধ করে দিলে ব্যবসা সংগ্রহে বড় ধরনের ধস নামার সম্ভাবনা রয়েছে। অভিজ্ঞদের মতে, ট্যারিফ প্রিমিয়ামের উচ্চ হার অনেক ক্ষেত্রে এজেন্টদের কমিশন সমন্বয়ের মাধ্যমে গ্রাহকদের জন্য সহনীয় রাখা হতো। এখন সেই পথ বন্ধ হওয়ায় বাজারে নতুন ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। আইডিআরএ-র এই সিদ্ধান্তের সফলতা নির্ভর করবে ডিজিটাল ও করপোরেট ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেল দ্রুত শক্তিশালী করার ওপর।
নন-লাইফ বীমায় ব্যক্তি এজেন্ট কমিশন বাতিল একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হলেও এর সফল বাস্তবায়ন অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। এটি যদি কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে এবং নেপথ্যে ভিন্ন উপায়ে কমিশন লেনদেন চলতে থাকে, তবে শৃঙ্খলার মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে। সফল রূপান্তরের জন্য কর্তৃপক্ষের প্রয়োজন হবে দৃঢ় নীতিগত স্থিরতা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সাথে আলোচনা করে একটি বিকল্প ডিজিটাল বিপণন কাঠামো তৈরি করা। ১৯৩৮ সালের আন্তর্জাতিক রীতি উপেক্ষা করে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত দেশের বীমা খাতকে কতটুকু এগিয়ে নেয়, তা সময়ই বলে দেবে।
