২০২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বাংলাদেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতা

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি সামগ্রিকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। বিনিময় হারের স্থায়িত্ব, শক্তিশালী বৈদেশিক খাত এবং নীতিগত কঠোরতা এই স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক গতকাল প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে, ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও বিচক্ষণ মুদ্রানীতি এবং রাজস্ব সংক্রান্ত পদক্ষেপগুলো সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারে সহায়ক হয়েছে।

বৈদেশিক খাতের অগ্রগতি ও রিজার্ভ পরিস্থিতি

প্রতিবেদনে বৈদেশিক খাতের উল্লেখযোগ্য উন্নতির চিত্র ফুটে উঠেছে। আলোচিত প্রান্তিকে বাণিজ্য ঘাটতি ৫.৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ালেও, প্রবাসী আয়ের (রেমিট্যান্স) ধারাবাহিক প্রবাহের কারণে চলতি হিসাবের ঘাটতি ০.৫৯৭ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টে ১.৭ বিলিয়ন ডলারের নিট প্রবাহ চলতি হিসাবের ঘাটতিকে পুষিয়ে দিয়েছে। এই সময়ে ১ বিলিয়ন ডলারের নিট মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক ঋণ দেশের বৈদেশিক অর্থায়নের শক্তিশালী অবস্থানকেই নির্দেশ করে।

বিনিময় হারের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বাজারভিত্তিক হার পদ্ধতি গ্রহণের পর টাকার মান মার্কিন ডলারের বিপরীতে মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল। জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে প্রতি ডলার ১২১.৮০ থেকে ১২২২.৬২ টাকার মধ্যে ওঠানামা করেছে। এছাড়া মোট সরকারি রিজার্ভের পরিমাণ ৩১.৪৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে (বিপিএম৬ অনুযায়ী ২৬.৬০ বিলিয়ন ডলার)।

অর্থনীতির প্রধান সূচকসমূহের তুলনামূলক চিত্র (Q1FY26)

সূচকপরিমাণ/হারমন্তব্য
বাণিজ্য ঘাটতি৫.৭ বিলিয়ন ডলারআমদানি-রপ্তানি ব্যবধান।
চলতি হিসাবের ঘাটতি০.৫৯৭ বিলিয়ন ডলাররেমিট্যান্সের প্রভাবে নিয়ন্ত্রিত।
টাকা-ডলার বিনিময় হার১২১.৮০ – ১২২.৬২ টাকাবাজারভিত্তিক স্থিতিশীল হার।
মোট বৈদেশিক রিজার্ভ৩১.৪৩ বিলিয়ন ডলারবৈদেশিক দায় হ্রাসের প্রভাবে স্থিতিশীল।
পলিসি রেট (নীতি সুদহার)১০%সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বজায়।
খেলাপি ঋণের অনুপাত৩৫.৭৩%ব্যাংকিং খাতে প্রধান ঝুঁকি।

মুদ্রাস্ফীতি ও রাজস্ব নীতি

মুদ্রানীতি কঠোর রাখার ফলে সাধারণ মুদ্রাস্ফীতির চাপ ধীরে ধীরে কমছে, যদিও খাদ্যপণ্যের দাম কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী ছিল। বিশ্ববাজারে পণ্যের মূল্য হ্রাস এবং ডলারের স্থিতিশীল বিনিময় হারের কারণে মুদ্রাস্ফীতির সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বজায় রেখে নীতি সুদহার (Policy Rate) ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে। অন্যদিকে, সরকারের রাজস্ব সংগ্রহে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে এবং ব্যয়ের গতি কিছুটা মন্থর ছিল। ফলস্বরূপ, ২০২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে সরকার একটি রাজস্ব উদ্বৃত্ত (Fiscal Surplus) রেকর্ড করেছে এবং নতুন করে ঋণ নেওয়ার পরিবর্তে নিট পরিশোধ করেছে।

ব্যাংকিং খাতের চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি

অর্থনীতির অন্যান্য সূচক ইতিবাচক হলেও ব্যাংকিং খাত এখনো চাপের মধ্যে রয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ খেলাপি ঋণের অনুপাত ৩৫.৭৩ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ব্যাংকগুলোর মুনাফা ও মূলধনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, এই খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সংশোধনমূলক ব্যবস্থা অব্যাহত রয়েছে।

উপসংহার: সাম্প্রতিক কাঠামোগত ধাক্কা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করে যে, অর্থনীতি বেশ ভালোভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। যদিও বিশ্ববাণিজ্যে উত্তেজনা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির মতো ঝুঁকি বিদ্যমান, তবুও বৈদেশিক খাতের শক্তিশালী অবস্থান এবং নীতিগত শৃঙ্খলা আগামী মাসগুলোতে একটি শক্ত ভিত্তি প্রদান করবে।