২০২৪ সহিংসতার তদন্তে ন্যায়বিচারের দাবি

ইতিহাস বারবার আমাদের শেখায়—অন্যায় যতই শক্তির আবরণে ঢাকা থাকুক না কেন, সত্য একসময় প্রকাশিত হয় এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পরও যেসব অপরাধী প্রকাশ্যে দম্ভভরে নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেছিল, তাদের বিচার এক পর্যায়ে সম্পন্ন হয়েছিল। এই অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়—বিচার বিলম্বিত হতে পারে, কিন্তু তা চিরদিন অমীমাংসিত থাকে না।

ঠিক তেমনই, ২০২৪ সালের জুন ও জুলাই মাসে দেশে সংঘটিত সহিংসতা ব্যাপক উদ্বেগ, শোক ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে শতাধিক সাধারণ মানুষ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য নিহত হওয়ার অভিযোগ উঠে এসেছে। সহিংসতার প্রকৃতি, পটভূমি এবং দায়ীদের পরিচয় নিয়ে জনমনে যে সংশয় তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে প্রয়োজন একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, যদি এই ঘটনায় কোনো সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র থেকে থাকে, তবে তা উদ্ঘাটন করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। আইনের শাসন কেবল অপরাধীদের শাস্তি প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি সত্য উদ্ঘাটনের একটি সুসংহত প্রক্রিয়া, যা সমাজে আস্থা ফিরিয়ে আনে।

সম্প্রতি মুহাম্মদ ইউনুসের বক্তব্য, যেখানে তিনি ‘পরিকল্পিত সহিংসতা ও সরকার পতনের উদ্দেশ্যে হত্যা’ নিয়ে অভিযোগ তুলে দিয়েছেন, জনপরিসরে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একইভাবে কথিত ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে পরিচিত জঙ্গি মাহফুজকে আন্তর্জাতিক পরিসরে উপস্থাপন করা নিয়েও বিতর্ক চলছে। এছাড়া আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়ার বক্তব্য, যেখানে ৫ আগস্ট সরকার পতনের সম্ভাবনা ও সশস্ত্র আন্দোলনের ইঙ্গিত আছে বলে দাবি করা হয়েছে, তা ও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

বিভিন্ন পক্ষের অভিযোগ এবং বাস্তব তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। তাই দেশের নাগরিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রমাণ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ ছাড়া কেবল বক্তব্য ও গুজবের ভিত্তিতে দোষী সাব্যস্ত করা ন্যায়সংগত নয়।

নিম্নে সহিংসতা ও অভিযোগের মূল দিকগুলি সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—

বিষয়অভিযোগ / ঘটনাপ্রাসঙ্গিক মন্তব্য
নিহত সংখ্যাশতাধিক সাধারণ মানুষ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসরকারি ও স্বাধীন সূত্র যাচাই প্রয়োজন
ষড়যন্ত্রের অভিযোগপরিকল্পিত সহিংসতা ও সরকার পতনের চেষ্টামুহাম্মদ ইউনুস ও আসিফ ভুঁইয়ার বক্তব্য আলোচ্য
‘মাস্টারমাইন্ড’চিহ্নিত জঙ্গি মাহফুজআন্তর্জাতিক পরিসরে উপস্থাপনা বিতর্কিত
অপরাধ ও অনৈতিকতাদূর্নীতি, অপ্রকৃত সুবিধা গ্রহণনির্বাচনের ১৮ মাস পূর্বে অভিযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে

প্রকাশিত তথ্য ও বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করা না হলে সামাজিক দ্বিধা ও বিভ্রান্তি চলমান থাকবে। নাগরিকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকারকে অবশ্যই করতে হবে—

  1. একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন গঠন, যাতে সকল পক্ষের বক্তব্য, তথ্য ও প্রমাণ যাচাই করা যায়।
  2. গুজব ও বিভ্রান্তি প্রতিরোধে স্বচ্ছ তথ্যপ্রকাশ নিশ্চিত করা।
  3. প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় এনে বিচার কার্যকর করা।

সত্য অনুসন্ধান হল ন্যায়বিচারের প্রথম ধাপ। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলে জাতি তার ক্ষত কাটিয়ে সামনে এগোতে পারবে। প্রতিশোধ নয়, প্রতিহিংসা নয়—আইনের শাসনই একমাত্র ভরসা। নতুন সরকার এই প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছভাবে পরিচালনা করলে, সকল বির্তক থেকে দেশ সুন্দরভাবে পরিচালিত হবে। সত্যের জয় অবস্ভাব্য।

লেখকঃ এবিএম জাকিরুল হক টিটন, সম্পাদক ও প্রকাশক,  জি-লাইভ ২৪