১৫ বছরের নিচে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা, ফ্রান্সে বিল পাস

ফ্রান্সে ১৫ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস করেছে দেশটির আইনপ্রণেতারা। শিশুদের অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমের নেতিবাচক প্রভাব থেকে সুরক্ষা দেওয়া এবং তাদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশ নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাখোঁ এই সিদ্ধান্তকে সময়োপযোগী ও সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন।

সোমবার রাতে ফরাসি পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে দীর্ঘ ও প্রাণবন্ত আলোচনার পর বিলটি ভোটে তোলা হয়। ভোটাভুটিতে ১৩০ জন সংসদ সদস্য বিলের পক্ষে এবং ২১ জন বিপক্ষে ভোট দেন। বিপুল সমর্থনে গৃহীত হওয়া এই বিলটি এখন উচ্চকক্ষ সিনেটে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। সিনেটের অনুমোদন পেলেই এটি আইনে পরিণত হবে।

প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, এই ভোট ফরাসি শিশু ও কিশোরদের সুরক্ষায় একটি বড় অগ্রগতি। তাঁর মতে, শিশুদের আবেগ ও মনোজগত কোনোভাবেই বাণিজ্যিক স্বার্থের পণ্য হতে পারে না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, শিশুদের মানসিক বিকাশ যেন কোনো বিদেশি প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম বা অ্যালগরিদমের প্রভাবাধীন না হয়, সে বিষয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে।

প্রস্তাবিত আইনে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞাই নয়, বরং ফ্রান্সের হাইস্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের জন্য মুঠোফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ রাখার বিধানও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার পরিবেশ আরও মনোযোগী ও স্বাস্থ্যকর করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

বিশ্বব্যাপী শিশুদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের হার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগও তীব্র হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশুদের স্বাভাবিক সামাজিক দক্ষতা, ঘুমের অভ্যাস ও মানসিক স্থিতিশীলতার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। উদ্বেগ, হতাশা এবং আত্মমর্যাদাবোধে ঘাটতির মতো সমস্যার ঝুঁকিও বাড়ছে।

ফ্রান্সের এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। গত বছরের ডিসেম্বরে অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করে আইন পাস করেছিল। সে ক্ষেত্রে ফ্রান্স হবে এ ধরনের আইন প্রণয়নকারী দ্বিতীয় দেশ।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের শুরু থেকে নতুন অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে এই বিধিনিষেধ কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। ফ্রান্সের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমানে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁর দল রেনেসাঁর নেতা গ্যাব্রিয়েল আতাল আশা প্রকাশ করেছেন, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ের মধ্যেই সিনেট বিলটি অনুমোদন দেবে। এতে করে আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকেই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা সম্ভব হবে।

আইন কার্যকর হওয়ার পর বয়সসীমা না মানা বিদ্যমান অ্যাকাউন্ট বন্ধ করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোকে চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় দেওয়া হবে। পাশাপাশি একটি নির্ভরযোগ্য ও কার্যকর বয়স যাচাই ব্যবস্থাও চালু করতে হবে। এ জন্য ইউরোপীয় পর্যায়ে একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরির কাজ চলছে।

তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। শিশু সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা নয়টি সংগঠন আইনপ্রণেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, শিশুদের সরাসরি নিষিদ্ধ করার বদলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর আরও কঠোর জবাবদিহি আরোপ করা উচিত।

মূল তথ্য এক নজরে

বিষয়তথ্য
নিষেধাজ্ঞার বয়সসীমা১৫ বছরের নিচে
নিম্নকক্ষে ভোটপক্ষে ১৩০, বিপক্ষে ২১
কার্যকরের সম্ভাব্য সময়১ সেপ্টেম্বর
বিদ্যমান অ্যাকাউন্ট বন্ধের সময়সীমা৩১ ডিসেম্বর
অনুরূপ আইনকারী দেশঅস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স

এই আইন কার্যকর হলে ফ্রান্সে শিশু ও কিশোরদের ডিজিটাল জীবনে একটি নতুন অধ্যায় শুরু হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।