ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের এক সময়ের উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং শৈল্পিক মিডফিল্ডার অস্কার ডস সান্তোস জুনিয়র মাত্র ৩৪ বছর বয়সে পেশাদার ফুটবল থেকে আকস্মিক অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন। মূলত গুরুতর হৃদরোগজনিত সমস্যার কারণে ফুটবল মাঠকে চিরতরে বিদায় জানাতে বাধ্য হচ্ছেন তিনি। তার এই প্রস্থান ফুটবল বিশ্বে এক বিষাদময় আবহ তৈরি করেছে, কারণ সৃজনশীল ফুটবলার হিসেবে তার এখনো অনেক কিছু দেওয়ার বাকি ছিল।
Table of Contents
অসুস্থতা ও অবসরের প্রেক্ষাপট
অস্কারের বর্তমান ক্লাব সাও পাওলোর সাথে ২০২৭ সাল পর্যন্ত চুক্তির মেয়াদ ছিল। তবে মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়ে এখন তার জীবনের ঝুঁকিই বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত বছরের নভেম্বরে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর তার শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ‘ভ্যাসোভেগাল সিনকোপ’ (Vasovagal Syncope) নামক একটি সমস্যা ধরা পড়ে। এই রোগের কারণে রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দন হঠাৎ অস্বাভাবিকভাবে কমে গিয়ে রোগী জ্ঞান হারিয়ে ফেলতে পারেন, যা একজন অ্যাথলেটের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। চিকিৎসকদের পরামর্শে জীবন ও স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে তিনি চুক্তি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেন।
নিজের বিদায়ী বার্তায় আবেগাপ্লুত অস্কার বলেন:
“আমি আরও অনেকদিন খেলতে চেয়েছিলাম এবং আমার শৈশবের ক্লাবকে আরও সাফল্য এনে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বাস্তবতা এবং শারীরিক সীমাবদ্ধতা আমাকে থামিয়ে দিয়েছে। তবে মাঠের ভেতরে না থাকলেও, গ্যালারি থেকে একজন নিবেদিত সমর্থক হিসেবে আমি সবসময় সাও পাওলোর পাশে থাকব।”
বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের এক ঝলক
অস্কারের ফুটবল যাত্রা শুরু হয়েছিল ব্রাজিলের ক্লাব ফুটবল থেকে, তবে তিনি বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পান ইউরোপীয় ফুটবলে তার জাদুকরী পারফরম্যান্সের মাধ্যমে। ২০১২ সালে ইংলিশ জায়ান্ট চেলসিতে যোগ দেওয়ার পর তিনি ব্লুজদের মাঝমাঠের প্রাণভ্রমরা হয়ে ওঠেন। চেলসির হয়ে তিনি দুটি প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা এবং একটি ইউরোপা লিগ জয়ের স্বাদ পান। এরপর সবাইকে চমকে দিয়ে তিনি চীনের ক্লাব সাংহাই পোর্টে যোগ দেন এবং সেখানেও তার সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন।
জাতীয় দলে অস্কারের অবদান
ব্রাজিল জাতীয় দলের হয়ে অস্কারের অভিষেক হয় ২০১১ সালে। এরপর তিনি খুব দ্রুতই সেলেসাওদের মাঝমাঠের অন্যতম ভরসা হয়ে ওঠেন। ২০১৩ সালে ব্রাজিলের কনফেডারেশনস কাপ জয়ে তার ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। তবে ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে জার্মানির কাছে সেই ঐতিহাসিক হারের ম্যাচে ব্রাজিলের হয়ে একমাত্র গোলটি করেছিলেন তিনি, যা সমর্থকদের হৃদয়ে এক মিশ্র অনুভূতির জন্ম দেয়।
অস্কারের খেলোয়াড়ী জীবনের পরিসংখ্যান ও অর্জন:
| পর্যায় | ক্লাব/দল | প্রধান অর্জন/শিরোপা |
| ইউরোপীয় ফুটবল | চেলসি (ইংল্যান্ড) | ২x প্রিমিয়ার লিগ, ১x ইউরোপা লিগ |
| এশীয় ফুটবল | সাংহাই পোর্ট (চীন) | ৩x চীনা সুপার লিগ |
| ব্রাজিলীয় ফুটবল | ইন্টারন্যাসিওনাল ও সাও পাওলো | একাধিক আঞ্চলিক ও ঘরোয়া টুর্নামেন্ট |
| আন্তর্জাতিক | ব্রাজিল জাতীয় দল | ২০১৩ কনফেডারেশনস কাপ জয় |
| ব্যক্তিগত মাইলফলক | চেলসি ও ব্রাজিল | ৪৮ ম্যাচে ১২টি আন্তর্জাতিক গোল |
সমাপ্তি
২০২৪ সালে তিনি নিজের ঘর বা শৈশবের ক্লাব সাও পাওলোতে ফিরেছিলেন ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়টি রাঙাতে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে শারীরিক অসুস্থতা তাকে সেই সুযোগ দিল না। অস্কারের বিদায় কেবল ব্রাজিলের জন্য নয়, বিশ্ব ফুটবলের জন্যই এক অপূরণীয় ক্ষতি। তার শৈল্পিক পাস, দূরপাল্লার শট এবং শান্ত মেজাজের ফুটবল খেলার ধরণ ভক্তদের হৃদয়ে চিরকাল অমলিন হয়ে থাকবে। ফুটবল বিশ্ব আজ তার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করছে।
